সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয়কে আনতে চায় ইউজিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয়কে আনতে চায় ইউজিসি
‘উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণা বাড়ানো, গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো, পেটেন্টে উৎসাহ দেওয়া এবং সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনকেন্দ্র বা ইনকিউবেশন হাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬-এ ‘উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। একই সঙ্গে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে লক্ষ্য রয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র এবং অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টির কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে ইউজিসি।

সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সেখানে অসাধারণ সব উদ্ভাবনী ধারণা দেখেছি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যেসব নতুন ধারণা নিয়ে আসছে, সেগুলো বাণিজ্যিকীকরণের পর্যায়ে নিতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে, এ বিশ্বাস আমাদের আছে।’

মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে বের করে নতুন কাঠামোয় নিয়ে আসাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আর্থিক সংকট, সরকারি নীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক চাহিদার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। তবে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের মডেল সরাসরি অনুসরণ না করে নিজেদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রূপান্তর ঘটাতে চায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্ভাবনী কার্যক্রম এখন অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যালয় রয়েছে, কোথাও ইনকিউবেশন হাব রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিংবা কতদিন ধরে চলছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। এসব কার্যক্রমকে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যে আনতে চায় ইউজিসি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী শুধু ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন—এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার পাশাপাশি অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টি করতে পারে, এমন ধারণা ও পরিকল্পনা নিয়েও যেন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

এ জন্য সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনকেন্দ্র বা ইনকিউবেশন হাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এসব কেন্দ্র থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নতুন ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তা এবং উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উদ্ভাবন ও গবেষণা প্রতিযোগিতা আয়োজন করে সেরা উদ্যোগগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণায় অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব আসে। শিল্প, সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে যৌথ গবেষণা প্রকল্প ও গবেষণাগার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন আলোচকেরা।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পেটেন্ট, নতুন পণ্য তৈরি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রচলিত কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রস্তাবও এসেছে আলোচনায়। গবেষণাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি পেটেন্ট, উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের মতো বিষয় শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তার পাশাপাশি তাঁদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্প খাতকে যুক্ত করা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ এবং কর্মবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতাভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালুর প্রস্তাবও এসেছে।

এ ছাড়া উদ্ভাবন ও গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, জাতীয় গবেষণার জন্য তথ্যকেন্দ্র ও তথ্যভান্ডার তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন আলোচকেরা।

পেটেন্ট পাওয়ার প্রক্রিয়ার জটিলতা কমাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

পরিকল্পনাগুলো একসঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রথম ধাপে পাঁচ থেকে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালুর প্রস্তাবও এসেছে গোলটেবিলে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খানের সঞ্চালনায় আলোচনায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. উম্মে সালমা জোহরাসহ ইউজিসি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এপিইউবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিসিক, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ও স্টার্টআপ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এমএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর