ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই বিজ্ঞান ইউনিটে (এ ইউনিট) এ ব্যবস্থা চালু হতে যাচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে একই দিনে পরীক্ষা হলেও বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র হবে ভিন্ন।
গত ২৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়ে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের পাঠ্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত পাঠ্যক্রমের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি করা হলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় ধরে রাখা সম্ভব হবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। তাঁদের মতে, এতে ভর্তি পরীক্ষায় বৈষম্য তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মাদ্রাসাসহ অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের জন্যও আলাদা প্রশ্নপত্রের দাবি উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র করা ঠিক হবে না। ভর্তি পরীক্ষা একটি হওয়া উচিত। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রম আলাদা হলেও প্রশ্ন পাঠ্যক্রমভিত্তিক না হয়ে যোগ্যতাভিত্তিক হওয়া দরকার। একজন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত কী শেখার কথা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তার কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, সেটিই পরীক্ষায় যাচাই করা উচিত।
তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা একই গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মৌলিক বিষয়গুলো শেখে। তাই তাঁদের জন্য আলাদা প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। বড়জোর একই প্রশ্নের বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ রাখা যেতে পারে। এতে সবার জন্য একটি অভিন্ন ও ন্যায্য পরীক্ষা নিশ্চিত হবে।
মাধ্যমভেদে আলাদা প্রশ্নপত্র না করে সবার জন্য যোগ্যতাভিত্তিক অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা নেওয়াই ন্যায্য বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।
আলাদা প্রশ্নপত্র চালু হলে ভর্তি পরীক্ষার ন্যায্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, আলাদা প্রশ্নপত্র করা হলে কোন মাধ্যমের প্রশ্ন কঠিন বা সহজ হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। একইভাবে মাদ্রাসা, কারিগরি এবং ক্যামব্রিজ বা এডেক্সেলের মতো বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নের দাবি উঠতে পারে। এতে ভর্তি পরীক্ষা আরও জটিল হয়ে পড়বে। তাই বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা ও কারিগরি—সব শিক্ষার্থীর জন্য একটি যোগ্যতাভিত্তিক অভিন্ন প্রশ্নপত্র রাখা সবচেয়ে ভালো হবে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। একাধিক পর্যায়ে আলোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) ড. মো. আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী ঢাকা মেইলকে বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের প্রস্তাবটি বিভিন্ন ধাপে যাচাই-বাছাই ও আলোচনা শেষে অনুমোদন হয়েছে। প্রথমে প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট অনুষদে যায়। পরে ডিনের মাধ্যমে বিভাগগুলোতে পাঠানো হয়। বিভাগ ও অনুষদ পর্যায়ে আলোচনা শেষে তা ডিনস কমিটি, সাধারণ ভর্তি কমিটি এবং একাডেমিক কাউন্সিলে যায়। সব পর্যায়ের আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে চালু থাকা পৃথক প্রশ্নপত্রের ব্যবস্থাকেও নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উপউপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে বহু বছর ধরে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের ব্যবস্থা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সেখানে এ নিয়ে কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা বা অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নতুন ব্যবস্থাটি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেমন হবে পরীক্ষা কাঠামো
বর্তমানে ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা হয়। ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীদের বহুনির্বাচনী অংশে বাংলা, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন অথবা ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমা থেকে মোট ৬০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়। লিখিত অংশে বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ, বাংলা ও ইংরেজিতে ভুল সংশোধন এবং ব্যবসায় শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে মোট ৪০ নম্বর থাকে।
অন্যদিকে এ-লেভেল ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের প্রশ্নের কাঠামো আলাদা। তাঁদের বহুনির্বাচনী অংশে ইংরেজি, অ্যাডভান্সড ইংলিশ, ব্যবসায় শিক্ষা, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি বা গণিত থেকে নির্ধারিত নম্বরে পরীক্ষা নেওয়া হয়। লিখিত অংশে রাইটিং, ভুল সংশোধন এবং ব্যবসায় শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয় থাকে।

বিজ্ঞান ইউনিটে নতুন করে যে ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, সেখানেও বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র আলাদা হবে। বর্তমানে বাংলা মাধ্যমে বিজ্ঞান ও মানবিক শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য বহুনির্বাচনী অংশে বাংলা, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং গণিত, পরিসংখ্যান বা অর্থনীতির যেকোনো একটি বিষয় থেকে মোট ৬০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়। লিখিত অংশে বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ, ভুল সংশোধন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং গণিত, পরিসংখ্যান বা অর্থনীতির বিষয় থাকে।
অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমের এ-লেভেল ও সমমানের শিক্ষার্থীদের প্রশ্নে ইংরেজি, অ্যাডভান্সড ইংলিশ এবং বিজ্ঞানবিষয়ক নির্দিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কোন যুক্তি দেখাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
আলাদা প্রশ্নপত্রের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম যুক্তি হলো, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের একটি অংশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করা গেলে মেধাপাচার বা ব্রেন ড্রেন কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের পাঠ্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত পাঠ্যক্রমের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ তৈরি করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ, তাঁদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর পাঠ্যক্রমের সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাই এতে বৈষম্য তৈরি হবে বলে তাঁরা মনে করছেন না।
তবে এই যুক্তির বিপরীতে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম যাচাই না করে শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা যাচাই করা। অভিন্ন যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্রই বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে।
আলাদা প্রশ্নপত্র চালুর পর কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে ভবিষ্যতে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে বলেও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
উপউপাচার্য বলেন, ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষাগোষ্ঠী বৈষম্যের অভিযোগ বা আলাদা সুযোগের দাবি জানালে তা বিবেচনার সুযোগ থাকবে। নতুন কোনো ব্যবস্থা চালুর পর অসুবিধা দেখা দিলে তা সংশোধনের সুযোগও রয়েছে। তবে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।
ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ব্যবস্থায় নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে যাচ্ছে। একই দিনে একই ইউনিটের পরীক্ষা হলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী প্রশ্নপত্র হবে ভিন্ন।
এমএইচ/এআর




