মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জাবির রবীন্দ্রনাথ হলের মাঠ সংস্কারে নানা অনিয়মের অভিযোগ

মো. আশিকুল ইসলাম,জাবি
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

শেয়ার করুন:

জাবির রবীন্দ্রনাথ হলের মাঠ সংস্কারে নানা অনিয়মের অভিযোগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারে দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে অর্থ উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার এ প্রকল্পে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) ব্যবহার করে হল প্রশাসনের পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাজ শুরুর আগেই প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে।

জাবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের রিটেনশন মানির মুনাফা থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারের জন্য ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বান বা দরপত্র আহ্বানকারী টিম গঠনের সঙ্গে এ কার্যালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের নিয়ম রয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের মাঠ সংস্কারের দরপত্র আহ্বানে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ ও ডেপুটি কম্পট্রোলার আবু মোহাম্মদ কাওছারকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি টিম করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের কারও প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই। মাঠের সংস্কারকাজ তদারকির জন্যও পৃথক কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের অভিযোগ, উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ সীমিত রেখে এলটিএম পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরপত্রের নোটিশও গোপন রাখা হয় বলে তাদের অভিযোগ। সরেজমিনে হলের নোটিশ বোর্ডেও এ-সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের সভাপতি শহিদ বলেন, ‘সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো কাজের টেন্ডার হলে ক্যাম্পাসের লাইসেন্স করা সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা জানতে পারে। অনেক দিন ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল মাঠের কাজের টেন্ডার হবে বলে শুনে আসছি। নোটিশ বোর্ডও দেখেছি। কিন্তু টেন্ডার কখন দেওয়া হলো, তা আমি বা অন্য ঠিকাদারেরা জানি না।’

a249b789-dc03-4260-8bd6-5a346f85f118

দরপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে হল প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলে শুরুতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দপ্তর বিষয়টি জানে বলে জানায়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প দপ্তর এলটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করেছে। ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। হল প্রশাসন শুধু কাজ তদারকি করে বুঝে নেবে।

তবে এ দাবি নাকচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দপ্তরের উপপরিচালক ফাহমিদা মাছউদ বলেন, মাঠের টেন্ডার করা বা ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়ার কাজ প্রকল্প দপ্তর করেনি। এটি সম্পূর্ণ হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। টেন্ডার ছাড়া এত টাকার কাজ হওয়ার সুযোগ নেই। পরে কে বা কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, সেটিও তাদের জানানো হয়নি।

এদিকে হল প্রশাসনের দাবি, তারা যথাসময়ে টেন্ডার আহ্বান করেছে এবং নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাধ্যক্ষ ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’ কাজ করছে বলে জানালেও মাঠে কাজ করছেন আবুল হোসেন নামের এক ঠিকাদার। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’। সরকারি কাজ করার মতো বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই বলে আবুল হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন।

b3cc15bf-f931-4c82-a792-2fff7cb29e81

মাটি না কিনে লেকপাড় থেকে নেওয়ার অভিযোগ

গত ২৫ ও ২৬ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে থেকে মাটি না কিনে হলের পশ্চিম পাশের গেরুয়া লেকের পাড়ের মাটি কেটে মাঠ ভরাট করা হচ্ছে। এ সময় মাঠের পূর্ব পাশে রবীন্দ্র চত্বরসংলগ্ন দুটি কৃষ্ণচূড়া গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে দেখা যায়।

ঠিকাদার আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি অরুণাপল্লীতে কাজ করতাম। আমি সরাসরি স্যারের (প্রাধ্যক্ষ) কাছ থেকে কাজটা নিছি। স্যার কত টাকা দিবে না দিবে, এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কোনো টেন্ডারও আমি নিইনি। হল থেকে যেভাবে দেখায়, আমি সেভাবে কাজ করছি।’

কাজটি করতে আনুমানিক কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় কাজটি হয়ে যাবে। তবে কাজ শেষে তাকে কত টাকা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি বলেও জানান তিনি।

d3cf6c2a-2465-4508-9c1c-14d424b85c94

কাজ শুরুর আগেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

মাঠের সংস্কারকাজ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হারুন বলেন, ‘যে টাকার কথা বলছেন, সেটা আমি আবার জমা দিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে রোববার সরাসরি আমি আপনাকে বলব।’

তবে কার কাছে এবং কবে টাকা জমা দিয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয় থেকেও টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মাঠের কাজ শুরু বা শেষ হয়েছিল কি না, তা তারা জানতেন না। তবে কাজ শেষ করার বিল জমা দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেক গত ১৯ আগস্ট নিয়ে গেছে।

কাজ শেষ না করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে গত তিন দিন ধরে ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর পরিচালক মো. হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি দেখা করে কথা বলবেন বলে সময় নিলেও পরে দেখা করেননি। সর্বশেষ মুঠোফোনে তিনি বলেন, অনিয়ম ও টাকার বিষয়টি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে এখন তিনি কথা বলবেন না।

এদিকে কাজ শুরুর আগেই টাকা উত্তোলনসহ বিভিন্ন অনিয়ম আড়াল করতে দ্রুত মাঠের সংস্কারকাজ শেষ করার জন্য হল সংসনের সহযোগিতায় প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রশাসনের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে বৃষ্টির মধ্যেও কাজ চালানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন

জনবল সংকটে সাদুল্লাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

স্বল্প সময়ে তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

গত ২৬ আগস্ট একাধিক গণমাধ্যমে মাঠ সংস্কারের দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি যাচাইয়ে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহবুব কবির বলেন, রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হলেও সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সাত দিন সময় নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ করা সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

কাজ শুরুর আগে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় ঠিকাদারের আবেদনের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। বিষয়টি তাদের জানা আছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।

বাইরে থেকে মাটি না এনে লেকপাড়ের মাটি ব্যবহারের বিষয়ে অধ্যাপক মাহবুব কবির বলেন, বিভিন্ন নির্মাণকাজের সময় কেটে রাখা কিছু মাটি সেখান থেকে আনা হয়েছে। পরে তার ওপর মাটি দিয়ে রোলার করা হবে। প্রকল্পের শিডিউলে বিষয়টি উল্লেখ ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি। তবে তদন্ত কমিটি কোনো ধরনের চাপের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিবেদন দেবে বলে জানান।

জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে গেলে এর পরপরই হলের শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাহমুদুল হাসান ইমন (বাবু) একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট পজিটিভ, রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জমা দেওয়া হবে। ভিসি পারমিশন দিলেই কাজ শুরু হবে। কত দ্রুত ভিসির পারমিশন পাবো, সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীদের বল প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে।’

এ বিষয়ে জানতে মাহমুদুল হাসান ইমনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অভিযোগের তদন্ত করে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম বলেন, ‘টেন্ডার ছাড়া প্রশাসনিক কাজ হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, জবাবদিহিতা থাকে না। এই হল মাঠ সংস্কারের কাজ পেছানোর বিষয়ে একটি প্রশাসনিক চক্র আগে থেকেই কাজ করছে। তদন্তের মাধ্যমে এই প্রহসনের সত্যতা সামনে আসুক, সেটাই প্রত্যাশা।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে মুঠোফোন ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর