রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ছুটির দিনে জাবিতে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

আশিকুল ইসলাম, জাবি
প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

ছুটির দিনে জাবিতে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

ছুটির দিন এলেই যেন বদলে যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চিত্র। শিক্ষার্থীদের কোলাহল কমলেও বেড়ে যায় বহিরাগতদের আনাগোনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ- প্রশাসনের এমন নির্দেশনা থাকলেও শুক্রবার প্রধান প্রবেশপথ ডেইরি গেট ও প্রান্তিক গেটে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। 

পরিচয় যাচাই ছাড়াই অনেককে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেখা গেছে। আধা ঘণ্টায় প্রান্তিক গেট দিয়ে প্রায় ৪০ জনকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেখা যায়। ক্যাম্পাসের ভেতরেও বিভিন্ন বয়সি মানুষের অবাধ চলাচল ছিল। এতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনও স্বীকার করছে, কয়েকটি গেট নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি রয়েছে। 

শুক্রবার ডেইরি গেট ও প্রান্তিক গেটে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করে বহিরাগত প্রবেশের এমন চিত্র দেখা যায়। প্রান্তিক গেটে আধা ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে প্রবেশ করা প্রায় ৪০ জনের অনেকের কাছেই পরিচয় জানতে চাওয়া হয়নি। কেউ এসেছেন ঘুরতে, কেউ আশপাশের এলাকা থেকে দৈনন্দিন প্রয়োজনে। ক্যাম্পাসে ঢোকার পরও তাদের চলাচলে তেমন কোনো বিধিনিষেধ দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক, চত্বর ও দর্শনীয় স্থানে তাদের ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। 

2

বহিরাগতদের বাড়তি উপস্থিতির প্রভাব পড়ছে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাতেও। সরেজমিনে কয়েকজন রিকশাচালককে শিক্ষার্থীদের তুলনায় বহিরাগত যাত্রী নিতে বেশি আগ্রহী দেখা যায়। 

রিকশাচালক আল-আমিন বলেন, বহিরাগতদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি ভাড়া পাওয়া যায়। এ কারণে তাদের যাত্রী হিসেবে নিতে রিকশাচালকদের আগ্রহ বেশি। 

ডেইরি গেটের নিরাপত্তাকর্মী কিবরিয়া বলেন, শুক্রবার ও শনিবার বহিরাগতদের চাপ বেশি থাকে। শিক্ষার্থীদের রেফারেন্সেই বেশি বহিরাগত ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, ‘যারা আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী আছে, তারা যদি বহিরাগত না নেয়, আমরা চ্যালেঞ্জ কইরা আটকায় দিতে পারবো।’ 

নিরাপত্তাকর্মীদের জনবল সংকটের কথাও জানান কিবরিয়া। তিনি বলেন, যোগদানের সময় তাদের শাখায় ১০৬ জন সদস্য ছিলেন। বর্তমানে ৮০ জনের মতো রয়েছেন। 

3

প্রান্তিক গেটের নিরাপত্তাকর্মী শরীফও একই ধরনের তথ্য দেন। তিনি জানান, বর্তমানে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা ৮০ জনের মতো। কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য ১২০ থেকে ১৩০ জন সদস্য প্রয়োজন। 

বহিরাগত প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে দেওয়া রেফারেন্সকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন শরীফ। তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পূর্ণভাবে নিষেধ বহিরাগত। কিন্তু যারা ভিতর থেকে ফোন দিয়ে রেফারেন্স দেয়, অনেকে বাইরে ফোন দেয়, দিলে তো তখন ঢুকতে দেওয়া লাগে।’ 

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রান্তিক গেটে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মানুষের যাতায়াত চলে। আশপাশের আমবাগান ও ইসলামনগর এলাকার লোকজনও নিয়মিত এ গেট দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। গত সপ্তাহে এক নিরাপত্তাকর্মীর ওপর বাইক তুলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। 

বহিরাগতদের কারণে নিরাপত্তার পাশাপাশি দৈনন্দিন চলাফেরায়ও ভোগান্তির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। 

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের স্নাতক ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া দিবা বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে চলাফেরার সময় নিরাপত্তার একটা নিশ্চয়তা থাকা উচিত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বা নির্জন জায়গায় অপরিচিত মানুষের অবাধ চলাচল আমাদের মধ্যে অস্বস্তি ও অনিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। সব বহিরাগতই সমস্যা নয়, তবে যথাযথ নজরদারি না থাকলে আমাদের নিরাপত্তাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আমরা এমন ক্যাম্পাস চাই, যেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারব, নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিতে নয়।’

4

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাসিন বলেন, ‘বহিরাগতদের উপস্থিতির কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে অসুবিধা হওয়া। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত অটোরিকশা ও কার্ট পাওয়া যায় না। বহিরাগতদের বিভিন্ন মন্তব্য ও আচরণেও শিক্ষার্থীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।’ 

ছুটির দিনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও বহিরাগতদের উপস্থিতি বেড়ে যায় উল্লেখ করে তাসিন বলেন, এতে বিভিন্ন স্থানে ভিড় ও ময়লা-আবর্জনা বাড়ে। খাবারের দোকানগুলোতেও চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায় না, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। 

রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার তমা বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসটা শুধু আমাদের জন্য থাকা উচিত। শুক্রবারসহ বিভিন্ন ছুটির দিনে বহিরাগতদের উপস্থিতি বেড়ে গেলে মনে হয় এইটা আমার ক্যাম্পাস না, এটা বাইরের একটা জায়গা।’ 

বহিরাগতদের উপস্থিতিতে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। শিশু থেকে মধ্যবয়সি বিভিন্ন বয়সি মানুষ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করায় মাঝে মাঝে নিজেকে ‘আনসেফ’ মনে হয় বলে জানান তমা। 

ক্যাম্পাসে আসা বহিরাগতদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিনোদনের জায়গা হিসেবেই দেখছেন। 

সাভার থেকে ঘুরতে আসা আফিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘মামা প্লাজায় কেনাকাটা এবং পরে জাবি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার জন্য এসেছি।’ 

5

আশপাশে ঘোরার জায়গা কম থাকায় বিনোদনের জন্য ক্যাম্পাসে এসেছেন বলে জানান তিনি। প্রান্তিক গেট দিয়ে ঢোকার সময় তেমন কোনো বাধা পাননি বলেও জানান আফিয়া। 

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা (ডেপুটি রেজিস্ট্রার) মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আমি নিজে কোনো বক্তব্য দিতে পারি না। রেজিস্ট্রার যদি বলে, তাহলে আমি দিতে পারি। রেজিস্ট্রার মহোদয় আমাদের অফিস প্রধান। উনার অনুমতি ছাড়া আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারি না।’ 

তবে এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার এবিএম আজিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ। বহিরাগত বলতে বাইরে যাদের ক্যাম্পাসের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই, তাদের কিন্তু প্রবেশ নিষেধ। প্রত্যেকটা গেইটেই এবং সিকিউরিটিকে বলে দেওয়া আছে।’ 

তবে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সমাধানের জন্য অটোমেশনভিত্তিক প্রবেশব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছেন প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন। 

তিনি বলেন, পাস বা কার্ডের মাধ্যমে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কোনো গেট খোলা না রাখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার যেসব অংশ দিয়ে মানুষ প্রবেশ করতে পারে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর