শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগে দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ ডিবেটিং ক্লাব (টিসিডিসি) আয়োজিত ‘১ম জাতীয় বিতর্ক উৎসব ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পর দেশের নানা সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঘাটতিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পরও কাঙ্ক্ষিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়নি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও তা হয়নি। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সারাদেশে এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজেদের ছোট করে না দেখার আহ্বান জানিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, ‘প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। গ্রামীণফোনের সিইও, প্রধান বিচারপতি কিংবা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মনে ‘আমি কেন নয়’—এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক খাতসহ বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি চাকরি বেসরকারি খাতে এবং এই খাতে কর্মরত গ্র্যাজুয়েটদের ৮২ থেকে ৮৩ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। ফলে শিক্ষার্থীদের নিজেদের নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই।’
শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘সমাজে মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব থাকবেই। তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। শিক্ষাঙ্গনে কে ভালো গবেষণা করবে, কার পিয়ার রিভিউ জার্নাল ভালো হবে কিংবা কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো বিতর্ক করতে পারবে— এসব বিষয় নিয়ে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করলেই একটি আদর্শ শিক্ষাঙ্গন গড়ে উঠবে।’
উত্তর আমেরিকায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় এক লাখ গ্র্যাজুয়েট কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একজন অ্যাটর্নিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। তাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০টি কলেজ পরিদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।’
সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিতর্ক আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুক্তিনির্ভর চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যারা সাফল্য অর্জন করেছেন, তাদেরও এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বিতর্ক, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তেজগাঁও কলেজকে একটি মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ড. আমানুল্লাহ বলেন, কলেজটিতে কালচারাল ক্লাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, সাইবার সিকিউরিটি ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব ও মাইন্ড ক্লাবসহ শিক্ষার্থীদের বিকাশে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ক্লাব থাকা উচিত। একই সঙ্গে কলেজটির হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টসহ প্রফেশনাল কোর্সগুলোর প্রশংসা করে তিনি বলেন, এসব কোর্সের শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকরি পাচ্ছেন। তেজগাঁও কলেজকে অন্যদের সামনে একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরতে চায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান বলেন, বিতর্ক তরুণদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তির মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে শেখায়। একজন ভালো বিতার্কিকের প্রধান শক্তি হলো চিন্তার গভীরতা, যুক্তির স্বচ্ছতা এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা ও তা খণ্ডন করার সক্ষমতা। কোন তথ্য সত্য, কোনটি যুক্তিসংগত আর কোনটি কেবল আবেগনির্ভর—তা যাচাই করার ক্ষমতাই একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি।
‘তারুণ্যের কলতানে, মুক্তির জয়গানে জেগে উঠুক বাংলাদেশ’—স্লোগানকে সামনে রেখে টিসিডিসি আয়োজিত ১ম জাতীয় বিতর্ক উৎসব ২০২৬-এর আন্তঃকলেজ পর্বের উদ্বোধন করেন ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
এবারের বিতর্ক উৎসবে কলেজ পর্যায়ের ৩২টি ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৩২টি দলসহ মোট ৬৪টি দল অংশ নেয়।
তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক শামীমা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান। এছাড়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার এবং মো. ফখরুল ইসলাম ভূঁইয়া রবিনসহ সংশ্লিষ্টরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এম/এএম




