বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জাবির উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে পারে, অপরিবর্তিত থাকছে বাজেট

মো. আশিকুল ইসলাম, জাবি
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

জাবির উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বাড়তে পারে, তবে বাড়ছে না বাজেট
জাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হবে না; বরাদ্দ করা অর্থের মধ্যেই সব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির আওতায় মোট ২২টি নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি একটি বিদ্যমান ভবনের সম্প্রসারণ এবং কয়েকটি পুরোনো স্থাপনার সংস্কারকাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও কয়েকটি বড় কম্পোনেন্টের অগ্রগতি এখনো তুলনামূলক ধীর।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী নাসির বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায়। বর্তমানে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৭১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।

তিনি বলেন, শুরুতে প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরে দ্বিতীয় ধাপে ১৪টি প্রধান কম্পোনেন্টের টেন্ডার আহ্বান করা হয় এবং ২০২২ সালে সেগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সব কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্য, প্রথম ধাপের কাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে ছয়টি হল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দুটি, একই বছরের মার্চে আরও দুটি এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাকি দুটি হল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের কাজ চলছে। এর বেশির ভাগ অংশ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর বা ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কিছু কাজ ২০২৮ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। সে কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, প্রকল্পের কিছু অংশ এখন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করবে। টেন্ডার, কার্যাদেশ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের ওপর থাকবে; বিশ্ববিদ্যালয় কেবল তদারকির ভূমিকা পালন করবে। এ ধাপে জহির রায়হান মিলনায়তনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন, সড়ক নির্মাণ, সাবস্টেশন ও জেনারেটর স্থাপন, আসবাবপত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কম্পোনেন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১০১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন। বটতলা এলাকায় নির্মিত ভবনটির প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই এলাকায় ৬৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা লেকচার থিয়েটার-কাম-পরীক্ষার হলেরও প্রায় একই পরিমাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দুটি ভবনেরই কাজ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

টিচার্স কোয়ার্টার এলাকায় ৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা গেস্ট হাউস-কাম-পোস্টগ্র্যাজুয়েট ভবনের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই এলাকায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন গবেষক আবাসনেরও (রিসার্চার্স হাউস) প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের আনুভূমিক সম্প্রসারণের কাজ প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। জীববিজ্ঞান অনুষদের সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ। এ খাতে ব্যয় ৪৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের সম্প্রসারণ কাজের অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই ভবনের কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বর। একইভাবে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কলা ও মানবিকী অনুষদ ভবনের সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় শিক্ষকদের জন্য ১১ তলা আবাসিক টাওয়ার, কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক ১১ তলা আবাসিক টাওয়ার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আবাসিক টাওয়ার নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এসব ভবনের অধিকাংশের কাজ ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এ ছাড়া ১৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ তলা প্রভোস্ট কমপ্লেক্স এবং ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা হাউস টিউটরদের বাসভবনের কাজও প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সবচেয়ে বড় চলমান কম্পোনেন্টগুলোর একটি হলো ১১৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও সুইমিং পুল। এম এইচ হলসংলগ্ন এলাকায় নির্মিত এই স্থাপনার প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এটি ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের প্রথম ধাপে নির্মিত ছয়টি আবাসিক হলের প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

প্রকল্পের আওতায় নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ১০ তলা ভবনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে সেটি ছয় তলায় নামিয়ে আনা হয়েছে। টারজান এলাকায় ভবনটি নির্মাণের কথা থাকলেও এখনো টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি।

এ ছাড়া জহির রায়হান মিলনায়তনের সংস্কার, মুক্তমঞ্চ উন্নয়ন, ফুটপাত সংস্কারসহ কয়েকটি কাজের টেন্ডারও এখনো হয়নি। এসব কাজ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হবে।

প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, পরিবেশবাদীদের আপত্তি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থ ছাড়ে জটিলতা এবং নকশা পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় প্রকল্পের অনেক কাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় নির্মাণকাজের গতি আরও কমে যায়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ভবনটি প্রথমে অন্য স্থানে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জমির উপযোগিতা ও পরিবেশবাদীদের আপত্তির কারণে স্থান পরিবর্তন করতে হয়। একইভাবে কলা ও মানবিকী অনুষদ এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ ভবনের ক্ষেত্রেও স্থান পরিবর্তন ও পরিবেশগত আপত্তির কারণে কাজ পিছিয়ে যায়। এ ছাড়া মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে আলোচনা, এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বান, প্রশাসনিক নির্দেশনায় কাজ বন্ধ থাকা এবং অর্থ ছাড়ে জটিলতার মতো কারণেও প্রকল্পের অগ্রগতি বারবার থমকে গেছে বলে জানান তিনি।।

 

প্রকল্প পরিচালক বলেন, মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের বাজেট বাড়ানো হবে না। বরাদ্দের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে। কোনো খাতে ব্যয় বাড়লে অন্য খাত থেকে সমন্বয় করা হবে। প্রয়োজনে কোনো কোনো কম্পোনেন্টের কাজের পরিধিও সীমিত করা হতে পারে।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন একক কোনো ব্যক্তির কাজ নয়; বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে এটি এগিয়ে নিতে হয়। তাই বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্তের ওপরও প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ভর করে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর