মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

গোল্ডেন এ+ হাতে চার বন্ধু, তবুও মন খারাপ

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

গোল্ডেন এ+ হাতে চার বন্ধু, তবু মন খারাপ বিদায়ের সুরে

চার বন্ধু। একই স্কুল। একই শ্রেণিকক্ষ। একই টিফিনের আড্ডা, খেলার মাঠ আর অসংখ্য স্মৃতি। বয়সে ছোট হলেও স্বপ্ন তাদের আকাশছোঁয়া। একসঙ্গে পথচলায় একে অন্যের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠা এই চার বন্ধু এবার এসএসসি পরীক্ষায়ও রেখেছে সাফল্যের স্বাক্ষর। প্রত্যেকেই পেয়েছে গোল্ডেন এ+।

তারা হলো— ওয়াসিফ আকন্দ, আব্দুল্লাহ মোহাইমিন স্বাধীন, আবু জুনাইদ ও ফাহমিদ ফারহান। রাজধানীর স্বনামধন্য মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তারা। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা ও সাফল্যের পথে এগিয়ে চলা এই চার বন্ধুর জীবনে এসএসসির ফল যেন আরেকটি মাইলফলক। তবে সাফল্যের আনন্দের পাশাপাশি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন প্রশ্ন— এবার কি আগের মতো একসঙ্গে থাকা হবে?

এসএসসির ফল প্রকাশের দিন চার বন্ধুর চোখেমুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল হাতে পেয়ে তারা যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি কৃতজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার প্রতি। নিজেদের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের অবদান, শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং নিজেদের নিয়মিত পড়াশোনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

শুধু এসএসসি না, স্কুলজীবনের প্রতিটি একাডেমিক ধাপেই ভালো ফলাফল করে এসেছে এই চার বন্ধু। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের বন্ধুত্বও ছিল গভীর। ক্লাসরুমে পাশাপাশি বসা, টিফিনের সময় গল্প করা, স্কুলের আঙিনায় ঘোরাঘুরি কিংবা খেলার মাঠে সময় কাটানো— সবকিছুতেই ছিল তাদের একসঙ্গে থাকা।

চারজনের পরিবার আলাদা, স্বভাবও আলাদা। কিন্তু স্কুলে এসে যেন তারা হয়ে উঠত একই পরিবারের চার সদস্য। একজনের মন খারাপ হলে অন্যরা পাশে দাঁড়াত। পড়াশোনায় কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে একে অন্যকে সহযোগিতা করত। পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি, ফল প্রকাশের পর আনন্দ কিংবা কোনো অর্জন—সবকিছুই ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভ্যাস ছিল তাদের। এবার সেই অভ্যাসে ছেদ পড়ার আশঙ্কা।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী শাখায় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ নেই। ফলে এসএসসি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চার বন্ধুর সামনে খুলে যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কলেজের দরজা। কে কোন কলেজে ভর্তি হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। একই কলেজে পড়ার সুযোগ হবে কি না, সেটিও তারা জানে না। এই অনিশ্চয়তাই সাফল্যের আনন্দের মধ্যে এনে দিয়েছে এক ধরনের বিষণ্নতা।

দীর্ঘদিনের পরিচিত শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের করিডোর, মাঠ কিংবা টিফিনের সেই চেনা সময়গুলো আর নিয়মিত ফিরে আসবে না। প্রত্যেকে হয়তো চলে যাবে ভিন্ন কলেজে। নতুন বন্ধু হবে, নতুন পরিবেশ হবে, নতুন ব্যস্ততা তৈরি হবে। তখন কি আগের মতো প্রতিদিন কথা বলা হবে? নিয়মিত দেখা হবে? বন্ধুত্ব কি দূরত্ব পেরিয়ে আগের মতোই থাকবে? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চার বন্ধুর মনে।

তবে বিদায়ের এই মুহূর্তকে তারা কেবল বিচ্ছেদের গল্প হিসেবে দেখতে চায় না। বরং স্কুলজীবনের স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় তাদের। গোল্ডেন এ+ তাদের কাছে কেবল একটি ফল নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নের পথে আরেকটি ধাপ।

চার বন্ধুর স্বপ্নও ছোট নয়। কেউ ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে চায়, কেউ বড় পরিসরে মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। তবে প্রত্যেকের স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে দেশ। নিজেদের যোগ্যতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে আগামীর বাংলাদেশ গড়ায় ভূমিকা রাখতে চায় তারা। তাদের চোখে তাই এসএসসির ফলাফল কোনো শেষ নয়, বরং নতুন শুরুর দরজা।

স্কুলের শেষ দিনগুলোতে দাঁড়িয়ে চার বন্ধু হয়তো বুঝতে পারছে, সময় কত দ্রুত বদলে যায়। যে মাঠে একসঙ্গে খেলেছে, যে শ্রেণিকক্ষে একসঙ্গে পড়েছে, যে টিফিনের সময় হাসি-ঠাট্টায় কেটেছে অসংখ্য দিন, সেসব এখন স্মৃতি হয়ে থাকবে।

তবু তাদের বিশ্বাস, কলেজ বদলালেও বন্ধুত্ব বদলাবে না। দূরত্ব বাড়লেও যোগাযোগ থাকবে। আর কোনো একদিন বড় হয়ে যখন পেছনে ফিরে তাকাবে, তখন হয়তো সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সেই দিনগুলো—যেখানে চার বন্ধু একসঙ্গে স্বপ্ন দেখেছিল, একসঙ্গে লড়েছিল এবং একসঙ্গে গোল্ডেন এ+ অর্জন করেছিল।

এখন সামনে তাদের নতুন পথ। নতুন কলেজ, নতুন পরিবেশ, নতুন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু স্বপ্ন সেই একই—বিশ্বকে জয় করা, নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলা এবং দেশের জন্য কিছু করা। গোল্ডেন এ+ দিয়ে সেই স্বপ্নযাত্রার প্রথম বড় সাফল্য তারা ইতোমধ্যে ছুঁয়ে ফেলেছে। এবার পালা আরও বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।

এমআর/আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর