কয়েকদিন আগেও বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে আড্ডা, ক্লাস আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) গণিত বিভাগের ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নিয়ামত উল্লাহ শোয়াইব। এখন তার দিন কাটছে হাসপাতালের শয্যায়। চোয়াল ভেঙে গেছে, স্থানচ্যুত হয়েছে সাতটি দাঁত। অস্ত্রোপচারের পরও তিনি কথা বলতে পারছেন না। নিজের প্রয়োজন, কষ্ট আর প্রশ্নগুলো জানাতে হচ্ছে কাগজে লিখে।
হাসপাতালে দেখতে যাওয়া বন্ধুদের হাতে তিনি একটি কাগজ তুলে দেন। সেখানে কাঁপা হাতে লেখা, ব্রেইন ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। নাস্তা করে নামাজ পড়ে স্লিপে (ঘুমাতে) যাই। ঠোঁটের ফোলা কমবে কখন? ব্রাশ কখন করতে পারব? কয়েকটি বাক্যেই যেন ফুটে উঠেছে তার বর্তমান শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার চিত্র।
পরিবার ও সহপাঠীদের জানায়, গত ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন নিয়ামত। আহত অবস্থায় তাকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আরেক দফা হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামলায় নিয়ামতের চোয়াল ভেঙে গেছে এবং সাতটি দাঁত স্থানচ্যুত হয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার চোয়ালের ভেতরে স্টিলের প্লেট বসানো হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, এক বছর পর আরেকটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্লেটটি অপসারণ করতে হবে। তত দিন তিনি স্বাভাবিকভাবে শক্ত খাবার খেতে পারবেন না।
হাসপাতালে গিয়ে নিয়ামতের সঙ্গে দেখা করেন- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পোস্ট করেন, ‘আমার বন্ধু নিয়ামত উল্লাহ শোয়াইব আজ কথা বলতে পারছে না। তার চোয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কাগজে লিখে লিখে কথা বলতে হচ্ছে।’
নিয়ামতের বন্ধু রাকিব উল ইসলাম বলেন, ‘হামলায় তার সাতটি দাঁত পুরোপুরি স্থানচ্যুত হয়েছে। মুখমণ্ডল ও চোয়ালের জটিল আঘাতের কারণে চিকিৎসকেরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। এখন খাবার গ্রহণ, কথা বলা, এমনকি স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।’
সহপাঠীরা দাবি করেন, ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের সময় নিয়ামত ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ কারণেই তিনি হামলাকারীদের রোষানলে পড়েন। বিষয়টি উল্লেখ করে আবদুল্লাহ আল ফারুক ফেসবুকে লেখেন, ‘তার দোষ ছিল শুধু সে ভিডিও করেছিল। সে কারণে তার ক্যাম্পাসের ছাত্রদলের আদুভাইরা তার চোয়াল ভেঙে দিয়েছে। ভিডিও করলে তার চোয়াল ভেঙে দিতে হবে?’
হাসপাতালের বেডে বসে কাগজে লিখছেন নিয়ামতের এমন কয়েকটি ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে সবুজ হাসপাতালের পোশাক পরা এই শিক্ষার্থীকে মাথা নিচু করে কিছু লিখতে দেখা যায়। যে তরুণ কয়েক দিন আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত ক্যাম্পাসে হাঁটতেন, আজ তিনি লিখছেন, ‘ঠোঁটের ফোলা কমবে কখন?” একটি প্রশ্নই যেন তার অসহায় অবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।’
এদিকে নিয়ামতের এমন অবস্থার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও সহমর্মিতা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জকসুর নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া-সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের চেষ্টা করলে প্রশাসনের বাধার অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে জকসু প্রতিনিধি, ছাত্রশক্তি, ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। পরে আহতদের ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/এমআই




