শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ঢাকা

আধুনিকতার বাইরে জাবির একমাত্র মিলনায়তন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, জাবি
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২৬, ০২:২৩ এএম

শেয়ার করুন:

আধুনিকতার বাইরে জাবির একমাত্র মিলনায়তন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্র জহির রায়হান মিলনায়তন। সমাবর্তন, নবীনবরণ, নাটক, সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব বড় আয়োজনের কেন্দ্র এই মিলনায়তন। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামটি।

গরমে অস্বস্তিকর পরিবেশ, সাউন্ড প্রুফিংয়ের অভাব, দুর্বল আলোকসজ্জা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অতিথিদের ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। বড় আয়োজনের সময় এসব সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।


বিজ্ঞাপন


বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জহির রায়হান মিলনায়তনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ আসন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ২৫০ আসনের একটি সেমিনার কক্ষ। সারা বছর ধরেই এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ব্যবহার বাড়লেও সেই তুলনায় উন্নয়ন হয়নি অবকাঠামোগত সুবিধার।

গ্রীষ্মকালে অডিটোরিয়ামের ভেতরের পরিবেশ অনেক সময় অসহনীয় হয়ে পড়ে। কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের অভাবে দীর্ঘ সময় অনুষ্ঠানে বসে থাকতে গিয়ে দর্শকদের অস্বস্তিতে পড়তে হয়। অনেককে মাঝপথে অনুষ্ঠান ছেড়ে বের হয়ে যেতেও দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু রায়হান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও পরিবেশ ঠিক রাখা যায় না। গরমকালে শব্দ আর গরমে দর্শক ও অতিথী দুজনই বিরক্ত হন।’

IMG_20260417_181226


বিজ্ঞাপন


অডিটোরিয়ামে পর্যাপ্ত সাউন্ড প্রুফিং না থাকায় বাইরের যানবাহনের শব্দ কিংবা আশপাশের কোলাহল সহজেই ভেতরে প্রবেশ করে। এতে বক্তৃতা, নাটক, সেমিনার ও কনফারেন্সের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আলোকসজ্জার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। মঞ্চ ও দর্শকসারিতে পর্যাপ্ত ও সমন্বিত আলো না থাকায় দৃশ্যমানতায় সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বিষয়টি বেশি অনুভূত হয়।

নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রবিন হোসেন বলেন, ‘অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথিরা আধুনিক অডিটোরিয়ামে বসেন, আর জাবিতে এলেই অস্বস্তিতে পড়েন। এটা আমাদের জন্য বিব্রতকর।’

এছাড়া রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অতিথিদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত আসন ব্যবস্থাও নেই। ফলে আয়োজকদের অনেক সময় সাময়িকভাবে আসন পুনর্বিন্যাস করতে হয়, যা বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক আধুনিক মিলনায়তন ও ফ্যাকাল্টিভিত্তিক অডিটোরিয়াম থাকলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখনো একটি পুরোনো কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থী সংখ্যা ও আয়োজনের পরিধি বাড়লেও সেই তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।

জানা যায়, ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জহির রায়হান অডিটোরিয়াম সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই প্রকল্পে রাস্তা, ফুটপাত, সাইকেল লেন এবং সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি।

এ নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে জাকসু মিটিং এ নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম। সংস্কার কাজে প্রশাসনের যথেষ্ট গাফিলতি ছিল তখন। কিন্তু এখন মতুন করে আর কোনও জটিলতা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রকল্পের আওতায় রাস্তা, ফুটপাত, মুক্তমঞ্চও সংস্কারের বিষয়টি উল্লেখ আছে। সর্বশেষ ৬ এপ্রিল আমরা একটা মিটিং করেছি। সর্বসম্মতিক্রমে এই কাজ দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনা পাশ করা হয়েছে। আশা করি খুবই দ্রুত টেন্ডার ডাকা হবে এবং কাজ শুরু হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দীন বলেন, ‘শিক্ষা ও প্রকৌশল অধিদফতরের সঙ্গে ইতোমধ্যে মতবিনিময় সম্পন্ন হয়েছে এবং উপাচার্যও এতে স্বাক্ষর করেছেন। বর্তমানে বিষয়টি ইডিতে রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্টরা যাচাই-বাছাই করছেন।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘খুব শিগগিরই টেন্ডার আহ্বান করা হবে এবং কাজগুলো মূলত ইডির তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হবে। এ পর্যন্ত প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আমাদের করণীয় সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অডিটোরিয়ামের সংস্কার কাজের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. নাজমুল ইমামের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তিনি বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছেন।’

পাশাপাশি সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ ও ফুটপাতের কাজও টেন্ডার প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। টেন্ডার সম্পন্ন হলেই এসব কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধাপে ধাপে সংস্কারই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান। স্বল্পমেয়াদে সাউন্ড প্রুফিং, উন্নত লাইটিং, ভেন্টিলেশন ও অস্থায়ী শীতল ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আধুনিক মানের আরেকটি বড় অডিটোরিয়াম নির্মাণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও আধুনিকায়নের অপেক্ষায় রয়েছে জহির রায়হান অডিটোরিয়াম। দ্রুত সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে বড় আয়োজন পরিচালনায় সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।


প্রতিনিধি/এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর