বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

অবসরের আগেই ইমেরিটাস পদে সুপারিশ ঘিরে ঢাবির ফার্মেসি অনুষদে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

অবসরের আগেই ইমেরিটাস পদে সুপারিশ ঘিরে ঢাবির ফার্মেসি অনুষদে বিতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রশীদকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার সুপারিশ ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরের আগেই ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের সাবেক এই চেয়ারম্যানকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার সুপারিশের জন্য একাডেমিক কমিটির এজেন্ডাভুক্ত করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করছেন অনুষদের একাংশের শিক্ষকরা। পাশাপাশি তার গবেষণা প্রকাশনা ও পূর্ববর্তী প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও অভিযোগগুলো অস্বীকার করে মো. আবদুর রশীদ বলছেন, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অধ্যাপকদের ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ দেওয়া হয়। শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। ফলে অবসরের পরও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। একাডেমিক কমিটি বা অনুষদ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমে এই পদ দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ৬৫ বছর বয়সে অবসরের পর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়ে থাকে।


বিজ্ঞাপন


তবে অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রশীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপক ছিলেন। তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান।

অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরের প্রায় তিন মাস আগেই তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য সেপ্টেম্বরে বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভার তার নাম এজেন্ডাভুক্ত করা হয়। সে সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক পদেই বহাল ছিলেন। শিক্ষক মহলের একাংশের দাবি, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় বিভাগের একাডেমিক কমিটির ২২৪তম সভা হয়। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর ফার্মেসি অনুষদের অনুষদ কমিটির সভায় ওই একাডেমিক কমিটির সুপারিশ পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একাডেমিক কমিটি ও ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ের সুপারিশও পাঠানো হয়।

তবে বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, অধ্যাপক আবদুর রশীদের আবেদন নিয়ে আলোচনার সময় সব সদস্যের মতামত নেওয়া হয়নি। অথচ সুপারিশপত্রে “সর্বসম্মতিক্রমে” সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে অনেক শিক্ষক এতে সম্মতি দেননি বলেও তাদের দাবি।


বিজ্ঞাপন


এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শায়লা কবির বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছি না। আপনি ফার্মেসি অনুষদের ডিন ড. সেলিম রেজা স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বিভাগের বিষয়গুলো আমরা দেখি। কিন্তু উনার ইমেরিটাস অধ্যাপক হওয়ার সব কার্যক্রম ডিন স্যারের অধীনেই হয়েছে। উনি ভালো বলতে পারবেন।”

এদিকে অধ্যাপক আবদুর রশীদের গবেষণা প্রকাশনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। জানা গেছে, তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৬০০। এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি স্থানীয় বাংলাদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালে তার ১৫০টির বেশি এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে ৯০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও বিভিন্ন স্থানীয় জার্নালে তার দেড় শতাধিক প্রবন্ধ রয়েছে।

শিক্ষকদের একটি অংশের দাবি, বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নাল (বিপিজে) এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস (ডিইউজেপিএস) — এই দুটি জার্নালের সম্পাদক ছিলেন ড. রশীদ নিজেই।

অভিযোগ রয়েছে, নিজের সম্পাদিত জার্নালে নিজের গবেষণা প্রকাশ করে সেগুলোকে গবেষণা ও প্রকাশনার তালিকায় যুক্ত করেছেন ড. রশীদ। শিক্ষক মহলের একাংশ একে একাডেমিক অসততা হিসেবে দেখছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনুষদের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের প্রভাব ব্যবহার করে ইমেরিটাস পদ পাওয়ার চেষ্টা করছেন অধ্যাপক আবদুর রশীদ। তারা বলছেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির সাদা দলের সদস্য এবং ইউট্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ড. সীতেশ চন্দ্র বাছারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আবদুর রশীদ বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলাম। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় দীর্ঘ সময় ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে গেছি। আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করা হচ্ছে। আসলে আমার ভালো অনেকের চোখে সহ্য হয় না।’

এদিকে ঢাবির ফার্মেসি অনুষদের সাবেক এই ডিনের বিরুদ্ধে পুরোনো কিছু অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। গুঞ্জন রয়েছে, বিভাগীয় চেয়ারম্যান থাকাকালে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের সময় তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনজনকে ভাইভা বোর্ডে রেখেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই ওই সদস্যদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া নিয়োগ বোর্ডের কাগজপত্রে ওই তিনজনের স্বাক্ষরও ছিল না। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ড. আবদুর রশীদ বলেন, ‘এ অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। চাইলে ওই সময়কার বোর্ডের সুপারিশ তালিকা চেক করে দেখতে পার। যদি এমন হতো আওয়ামী রেজিমে আমাকে ছাড় দেয়া হতো না।’

ড. আবদুর রশীদ আরও বলেন, “আমার জানা মতে, জানুয়ারিতে আমাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডাভুক্ত হয়েছে। আমি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নিয়েছি। সে হিসেবে জানুয়ারিতে আমি পুরোপুরি অবসরপ্রাপ্ত ছিলাম। তবে এলপিআরে থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভাগের মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করি না। ৩১ ডিসেম্বরের আগে একাডেমিক কমিটি বা ডিন কমিটি থেকে কোনো সুপারিশ করা হয়ে থাকলে, সেটি আমার জানা নেই। এটি তো দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। তাই বিভাগ থেকে হয়তো আগেই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমার কোনো জানা নেই। তবে অনেকেই হয়তো হিংসাত্মকভাবে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পায়তারা করছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই আবদুর রশীদের আবেদন নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, অবসরের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও অধ্যাপক আবদুর রশীদ এখনো বিভাগের নিজ কক্ষ ব্যবহার করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, অবসরের পর শিক্ষকদের অফিস কক্ষ ছেড়ে দিতে হয়। পরে নতুন শিক্ষকদের জন্য কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিশেষ পদ বা ইমেরিটাস মর্যাদা থাকলে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু এখনও ইমেরিটাস অধ্যাপক না হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিভাগের কক্ষ ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ফার্মেসি অনুষদের ডিন ড. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি পরে ফোন দেবেন বলে জানান।

এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর