৬০ জন শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের পর এবার ‘শাটডাউন’ ঘোষণা করায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)।
দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের ১৮তম দিনে গত রবিবার শাটডাউন ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সোমবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একাডেমিক ও শিক্ষক-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটের তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
এরই মধ্যে গত রোববার আন্দোলনে থাকা তিনজন সহযোগী অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শিক্ষকদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেন। এদিকে, সোমবার আন্দোলনরত শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচতলায় (গ্রাউন্ড ফ্লোর) অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এর আগে আন্দোলনকারীরা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। তবে ভিসি অন্য দিনের মতোই এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, টানা ১৯ দিনের আন্দোলনের মধ্যে কয়েক দিন একাডেমিক কার্যক্রম চললেও কার্যত অধিকাংশ সময় অচল ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। রোববার শাটডাউন ঘোষণার পর চূড়ান্ত পরীক্ষা, মিডটার্ম, ক্লাস টেস্টসহ নিয়মিত পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষকরা দাফতরিক কাজ থেকেও বিরত রয়েছেন। ফলে সোমবার দিনভর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল নগণ্য; ক্লাসরুম ও অডিটোরিয়ামসহ পুরো ক্যাম্পাস ছিল জনশূন্য। এদিন সকালে শিক্ষকরা অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে প্রশাসনিক দপ্তরে তালা দিয়ে প্রতিবাদ জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দপ্তরের প্রধান সুব্রত কুমার বাহাদুর বলেন, ‘শিক্ষকদের অনুরোধে আমরা দপ্তর থেকে বের হয়ে ভিসিের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছি। ভিসি ছুটি না দিলে আমরা ক্যাম্পাসেই অবস্থান করব।’
ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ধীমান কুমার রায় বলেন, ‘আমরা ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছি এবং প্রশাসনিকভাবে তাকে কোনো সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করছেন এ পর্যন্ত তিনজন পদত্যাগ করেছেন। আমাদের পদোন্নতির জন্য বোর্ড গঠন করার ছয় মাস অতিবাহিত হলেও ভিসি তা ঝুলিয়ে রেখেছেন।’
বিজ্ঞাপন
সেশনজটের আশঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় সেশনজটের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নেব। শিক্ষার্থীরা যেন কোনো সংকটে না পড়ে, সেদিকে আমাদের নজর থাকবে; কারণ শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘শিক্ষক সংকট নিরসন হলে শিক্ষার মান উন্নত হবে। বর্তমানে একজন শিক্ষককে পাঁচজন শিক্ষকের কাজ করতে হচ্ছে, যা শিক্ষার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে অন্তরায়।’
অন্যদিকে, শিক্ষকদের এই কর্মসূচিকে আইনবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা নিজেরা কর্মবিরতি পালন করতে পারেন, কিন্তু অন্যের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন না। এটি সরাসরি আইনপরিপন্থী। আমি আপনাদের স্পষ্টভাবে বলতে চাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকুন, অন্যথায় আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, তারা ২০১৫ সালের বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে জানায় যে, ২০২১ সালের অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করে পদোন্নতি দিতে হবে। দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এই নীতিমালা গ্রহণ করলেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তা কার্যকর না করায় জটিলতা বেড়েছে।
প্রশাসন বলছে, ২০২১ সালের নীতিমালা সিন্ডিকেটে পাস করে ইউজিসির অনুমোদনের পর দুই মাসের মধ্যে পদোন্নতি দেওয়া হবে। তবে আন্দোলনরত শিক্ষকদের অভিযোগ, ভিসি সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করেননি এবং তিনি চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে পারতেন। ভিসি’র অনড় অবস্থানের কারণেই এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে দাবি শিক্ষকদের।
প্রতিনিধি/একেবি




