দেশের মাদরাসাগুলোর শিক্ষার মান ক্রমেই কমছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান বাড়ছে না। প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়াই চলছে সারাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারি তথ্য বলছে, মাদরাসা শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের হার মাত্র ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। এমনকি এ হার বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪’-এর তথ্যে এই পরিস্থিতি উঠে এসেছে।
এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাবই এ সংকটের প্রধান কারণ। গত কয়েক বছরে নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক মাদরাসায় যোগ দিলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
এছাড়া অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সাম্প্রতিক সময়ে অবসরে গেছেন। তাদের জায়গায় নতুন নিয়োগ হলেও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় সামগ্রিকভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১২ সালে মাদরাসায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ছিল ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এ হার ১৯ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। ২০২১ সালে তা বেড়ে ২৬ শতাংশ অতিক্রম করে এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে পৌঁছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এ হার নেমে এসেছে ৯ দশমিক ১৯ শতাংশে।
নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রশিক্ষিত নারী শিক্ষকের হার ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, পরের বছরই তা কমে মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষকের মোট সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে যেখানে শিক্ষক ছিলেন ১ লাখ ৭ হাজার ৭২৮ জন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২ জনে। অর্থাৎ গত ১৩ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে অন্তত ২০ হাজার ৭৯৪ শিক্ষক।
প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার হ্রাস পাওয়ার কারণ হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, দেশে মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই সীমিত। কার্যত একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে দক্ষ করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষত সম্প্রতি অনেক নতুন শিক্ষক যুক্ত হয়েছেন এবং পুরনোদের অনেকে অবসরে গেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় নতুনদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে কাতলাসেন কাদেরিয়া কামিল মাদরাসার এ অধ্যক্ষ বলেন, সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নে রয়ে গেছে যথেষ্ট ঘাটতি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মানেও এর প্রভাব পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
মাদরাসা শিক্ষা অনেক আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ করেন দেলাওয়ার হোসেন আজিজী। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় পিটিআই রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্যও জেলায় জেলায় রয়েছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। অথচ মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য তেমন অবকাঠামো নেই। একইভাবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা যেখানে মিড-ডে মিল, উপবৃত্তি, পোশাকসহ নানা সুবিধা পাচ্ছে; সেখানে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এসব থেকে বঞ্চিত। এমনকি সরকার সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগের কথা বলছে তার বেশির ভাগই সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রিক।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দাখিল থেকে কামিল স্তর পর্যন্ত মোট মাদরাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৬৯টি। এর মধ্যে তিনটি মাদরাসা সরকারি এবং ৯ হাজার ২৬৬টিই বেসরকারি। তবে মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি মাদরাসাগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মূল বেতন-ভাতা সরকার দিয়ে থাকে।
এবতেদায়ি শাখা ছাড়া মাদরাসা শিক্ষায় রয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৯১ শিক্ষার্থী ও ১ লাখ ২৮ হাজার ৫২২ শিক্ষক। যদিও এতসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করতে প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কেবল একটি। সরকারি ও এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষকরাই সেখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান।
গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (বিএমটিটিআই) বর্তমানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ৪ হাজার ৪৩৫ শিক্ষক। তাদের বিপরীতে ইনস্টিটিউটে শিক্ষক রয়েছেন কেবল ১৭ জন। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীর অনুপাত ১:২৬১।
বিএমটিটিআইয়ের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদুল হক বলেন, একমাত্র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হিসেবে মাদরাসা শিক্ষকের সংখ্যার তুলনায় আমাদের সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন টিটিসিতেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলমান। তাছাড়া এ ইনস্টিটিউটকে একটি একাডেমিতে রূপান্তর এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আরো ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সাধারণ শিক্ষার তুলনায় প্রশিক্ষণে মাদরাসা শিক্ষকদের পিছিয়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা পরিসংখ্যানেও। বর্তমানে মাধ্যমিকে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৬৬ দশমিক ১০ শতাংশ হলেও দাখিল স্তরে সে হার মাত্র ৯ দশমিক ৬৬। এছাড়া আলিম স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ১০ দশমিক ১৬, ফাজিল (পাস) স্তরে ১৭ দশমিক ১৭, ফাজিল (অনার্সে) ৭ দশমিক ৪৮ এবং কামিল স্তরে ৭ দশমিক ২৮।
ক.ম/




