ক্লাস শেষে যখন সহপাঠীরা কেউ আড্ডায়, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খোশগল্পে, কেউবা বিশ্রামে- ঠিক তখনই ক্যাম্পাসের সিরাজী ভবনের সামনে ছোট্ট ব্যবসার স্টলে ছুটে যান এক তরুণ উদ্যোক্তা। রুমে বই-খাতা, ব্যাগ রেখে হাতে তুলে নেন জীবিকার আরেক অধ্যায়। দোকানে অর্জিত অর্থ দিয়ে একদিকে যেমন নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন, তেমনি পরিবারকেও সহায়তার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
নাম ইসমাইল হোসেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ইসমাইল একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও বটে। নিজে নিজেই গড়ে তুলেছেন একটি ছোট্ট ব্যবসার দোকান। দোকানের নাম দিয়েছেন গঞ্জের কাপড়। তার স্টলে সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত জামদানি, কাতান, সুতি, হাফসিল্ক, মনিপুরি, নকশি প্রিন্টসহ বিভিন্ন ধরনের এক কালার শাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়াও পাওয়া যায় হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া, ছেলেদের লুঙ্গি, গেঞ্জি ও গামছা ইত্যাদি পণ্য সামগ্রী।
বিজ্ঞাপন
এই তরুণ উদ্যোক্তার ব্যবসার শুরুটা অবশ্য স্বস্তির ছিল না। একদিকে অনিশ্চয়তা, অভিজ্ঞতার অভাব, অন্যদিকে সীমিত পুঁজি সবমিলিয়ে ব্যবসার শুরুতে বিপাকে পড়তে হয় ইসমাইলকে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। ছুটে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। পড়াশোনা আর ব্যবসা দু-দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো সহজ কাজ নয়। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্টের চাপের মধ্যেও সময় বের করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তার এই ছোট্ট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে ক্যাম্পাসে। প্রতিদিনই বাড়ছে ক্রেতার সংখ্যা, বাড়ছে আয়ের পরিমাণও। ছোট এই সাফল্যই তাকে দেখাচ্ছে বড় স্বপ্নের পথ।

আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসমাইল বলেন, প্রতিমাসে যে টাকা আয় করি সেই টাকা দিয়ে আমার নিজের মাসিক খরচ চালাতে পারি। নিজের খরচ নিজেই চালানোর চেষ্টা করি সব সময়।'
বিজ্ঞাপন
ক্যাম্পাসে বন্ধু-বান্ধবদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ কেউ বলে এভাবে পড়াশোনা নষ্ট হচ্ছে, কেন করিস। তবে আমি এসবে কান দেই না। বেশিরভাগ আপু ভাইয়ারা তারপর আমার বন্ধুরা আমাকে সবসময় সাহস জোগায়, অনুপ্রেরণা দেয়। বেশিরভাগ আপু-ভাইদের দৃষ্টিভঙ্গি পজিটিভ। তাদের অনুপ্রেরণা আমাকে সবসময় সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
মে দিবসের প্রেক্ষাপটে ইসমাইলের গল্প যেন এক বাস্তব উদাহরণ। একজন শিক্ষার্থী হয়েও নিজের হাতে কিছু উপার্জন করতে তিনি গর্ববোধ করেন। তিনি বলেন, কোনো শ্রমই ছোট নয়। নিজের শ্রমে কিছু একটা করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় অর্জন। শ্রমিক দিবসে আমার প্রত্যাশা হলো কেউ যেন শ্রমকে ছোট করে না দেখে। শ্রম যতই ছোট হোক না কেন, এটাকে সম্মান করা শিখতে হবে। এই শ্রমিকদের জন্যই আপনি, আমি বেঁচে আছি।
ভবিষ্যতে ইসমাইল একজন বড় ধরনের ব্যবসায়ী হতে চান। তিনি বলেন, আমার টার্গেট পড়ালেখা শেষ করে ব্যবসা করা। আমি মূলত খাবার এবং কাপড় নিয়ে কাজ করব। সামনে আমার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি করার পরিকল্পনা আছে।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণেও কাজ করতে চান ইসমাইল। তিনি বলেন, খুব তাড়াতাড়ি আমি দশজন শিক্ষার্থীকে তার নিজের খরচ চালাতে পারবে এমন ব্যবস্থা করে দেব। আমি কিছুদিনের মধ্যেই এটা শুরু করে দেব। তারা ব্যবসার প্রফিট দিয়ে ক্যাম্পাসে তাদের নিজেরদের খরচ চালাতে পারবে।
ক্লাসরুমের বেঞ্চ থেকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় ইসমাইলের এই যাত্রা শুধু তার নিজের নয়, বরং অসংখ্য তরুণ যাদের পড়াশোনা চলাকালীন পরিবার থেকে আর্থিক সাপোর্ট দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না, তাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। যেখানে প্রতিটি পরিশ্রমই এক একটি স্বপ্নের শেকড়।
প্রতিনিধি/এসএস




