শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। কেন্দ্রের ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছেন সন্তানরা। অন্যদিকে বাইরে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। সন্তানের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। ফলে চিন্তা তো একটু হবেই। আজ প্রথম দিন বাংলা বিষয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষমান অভিভাবকরা এমনটি জানালেন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী অদ্বৈতের বাবা আব্দুল আলিম বলেন, ছেলেকে ভেতরে দিয়ে আসলাম। এখন অপেক্ষা করছি। ওর মা আজ আসেনি।
নুরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর নিলার বাবা ময়নুল জানালেন, তার চার মেয়ে। বড় মেয়ে আজ পরীক্ষা দিচ্ছে। ফলে দিনটি বিশেষ তার কাছে। মেয়েকে যথাসময়ে কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বাইরে অপেক্ষা করছেন তিনি।

তিনি বলছিলেন, আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি তখন বাবা-মায়েরা সঙ্গে আসতো না। আমরা স্যারদের সঙ্গে গ্রামের ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু এখন তাদের সঙ্গে আসতে হয়। পরীক্ষা না শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা তাদের সন্তানদের এসএসির আজ প্রথম পরীক্ষা হওয়ায় সকাল সকাল এসেছেন। কেন্দ্র খুলেছে সকাল সাড়ে নয়টায়। এরপর ১৫ মিনিটে সকল পরীক্ষার্থীদের ঢুকিয়ে গেট লাগিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই মুহূর্তে কেন্দ্রটির বাইরে শতশত অভিভাবক অপেক্ষা করছেন।
কেন্দ্রের বাইরে কোনো বসার জায়গা না থাকায় তারা ফুটপাত এবং বন্ধ দোকানপাটের সামনে বসে অপেক্ষা করছেন। পরীক্ষা শুরু হয়েছে সকাল ১০টায় এবং শেষ হবে দুপুর ১টায়। এই তিন ঘণ্টা তারা বাইরেই অপেক্ষা করবেন বলে জানিয়েছেন।
বাইরে অপেক্ষমান কমবেশি সকল অভিভাবকদের হাতে বই, খাতা ও ছোট খাট জিনিস রাখার ব্যাগ।
আশরাফ আহমেদ নামে এক অভিভাবক বলছিলেন, ছেলেকে কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিলাম। আশপাশে তো বসার জায়গা নেই তাই হেঁটে সময় কাটাচ্ছি কিন্তু আজ তো ভীষণ গরম। ফলে কতক্ষণ থাকতে পারি সেটাই।
অন্যদিকে অনেক অভিভাবক প্রিয় সন্তানকে কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিয়ে স্ত্রী, আত্মীয়স্বজনকে মোবাইলে কল করে দোয়া চাচ্ছেন।
সন্তানদের পরীক্ষায় অংশ নিতে নিয়ে আসা মা–বাবা ও স্বজনরা কেন্দ্রের গেটের সামনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। কেউ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে, কেউ পাশের ছায়াযুক্ত স্থানে বসে অপেক্ষা করেন।
পরীক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন অভিভাবকেরা। অনেককে সন্তানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখে দোয়া করতে দেখা যায়। কেউ প্রবেশপত্র ঠিক করে দেন, কেউ আবার শেষবারের মতো কিছু নির্দেশনা দিয়ে বিদায় জানান।
মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল কেন্দ্রের সামনে কথা হয় অভিভাবক নাসিমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলেকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে দেওয়ার পর তার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। সন্তানের সিট ঠিকমতো হয়েছে কি না, সে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পেরেছে কি না—এই চিন্তাই বারবার মনে আসছিল।
মতিঝিল গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুল কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করা অভিভাবক শহিদুল ইসলাম বলেন, সকালে রাস্তায় কিছুটা যানজট থাকলেও সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছেন। তবে ভেতরে যেতে না পারায় বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাটাই এখন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সামনে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কথা বলছেন। কেউ সন্তানদের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন, কেউ আগের বছরের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অপেক্ষার এই সময়টুকু পার করতে অনেকে মোবাইলে কথা বলেন, কেউ আবার কেন্দ্রের গেটের দিকে তাকিয়ে সময় গোনেন।
অভিভাবক রেজাউল করিম জানান, সন্তান ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছে আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সময়টা সহজ নয়। তারপরও নিয়ম মেনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তারা শুধু চান সন্তান যেন ভালোভাবে পরীক্ষা শেষ করতে পারে।
কেন্দ্রগুলোর সামনে কিছু ছোট দোকানও এ সময় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। পানি, বিস্কুট, কলম, পেন্সিল ও স্কেল বিক্রি করতে দেখা যায় বিক্রেতাদের। মতিঝিল এলাকার বিক্রেতা সোহেল মিয়া জানান, পরীক্ষার সময় এ এলাকায় সবসময়ই ভিড় থাকে এবং বিক্রি বাড়ে। সকাল থেকেই ক্রেতার চাপ ছিল।
আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করা পরীক্ষার্থী সিয়াম আহমেদের বাবা জানান, ছেলেকে ভেতরে পাঠানোর পর তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষার সময়টা দীর্ঘ মনে হলেও সন্তানের পরীক্ষার কথা ভেবে ধৈর্য ধরে আছেন।
মতিঝিল গার্লস স্কুল কেন্দ্রের সামনে থাকা অভিভাবক নাসির উদ্দিন বলেন, সন্তানরা বড় একটি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, তাই তারাও মানসিকভাবে তাদের সঙ্গে আছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেও মন সবসময় ভেতরের দিকেই থাকে।
সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কেন্দ্রের সামনে ভিড় এক ধরনের স্থির অপেক্ষার পরিবেশ তৈরি করে। কেউ গাছের নিচে বসে থাকেন, কেউ পরিচিতদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সময় কাটান। পরীক্ষা চলাকালীন সময় ভিড় কিছুটা কমলেও শেষের দিকে আবার গেটের সামনে জমতে শুরু করে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে আবারও অভিভাবকেরা গেটের সামনে জড়ো হন। একে একে শিক্ষার্থীরা বের হলে তাদের ঘিরে তৈরি হয় স্বস্তির আরেকটি দৃশ্য। কেউ সন্তানের খোঁজ নেন, কেউ পরীক্ষার অভিজ্ঞতা জানতে চান, আবার কেউ দ্রুত বাসার পথে রওনা দেন। তবে দিনের শুরুতে গরম আবহাওয়ার কারণে অনেকে হাঁপিয়েও উঠেছেন। বেশিরভাগ নারী অভিভাবকদের হাতে কাগজের তৈরি বিশেষ হাতপাখা দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল, বালিকা, বালক, বেগম নুরজাহান, লালমাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্তত অর্ধশত বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র পড়েছে। তবে যারা গতবার অকৃতকার্য হয়ে এবার আবার পরীক্ষা দিচ্ছে তাদের জন্য কেন্দ্রটিতে আলাদা দুটি রুম বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এমআইকে/এএইচ/এআরএম




