বিচারিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আর সেই ভিত্তিকে দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘সংবিধান ও সংস্কার: নতুন বাংলাদেশ নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
শিশির মনির বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়; বরং সংসদ নিজেই সংবিধানের অধীন। তাই সংবিধানের সীমা অতিক্রম করে কোনো আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করা হলে তা টেকসই হবে না। সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার বা মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করলে আদালত তা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। সংসদে আইন পাস করলেই সেটি চূড়ান্ত হয়ে যায় না; সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আদালত সেটিকে বাতিল করতে পারে।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে শিশির মনির বলেন, জনগণ না বুঝেই ভোট দিয়েছে— এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ১৯৯১ সালের গণভোটে যেখানে তুলনামূলক কম ভোটার উপস্থিতি ছিল, সেটি মেনে নেওয়া হলেও বর্তমানে অধিক ভোটার অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এতে করে রাজনৈতিক বক্তব্যের অসংগতিই স্পষ্ট হয়। গণভোটের প্রশ্ন জটিল ছিল— এমন দাবি সঠিক নয়। প্রশ্নগুলো পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না এবং সাধারণ মানুষের বোঝার সক্ষমতাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়।
তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগ ও সংসদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়, সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাতিলের মতো বিষয়গুলোতে যে ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু থাকার পর সেটিকে হঠাৎ বাতিল করে দেওয়া যৌক্তিক নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ও বিচারিক উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কোনো আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের রেখে সেই আইন বাতিল করা হলে তা সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে যথাযথ আলোচনা ও সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা না গেলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যবস্থার ওপর পড়বে।
বিজ্ঞাপন
এএইচ/এফএ




