জন্ম থেকেই দুই হাত অচল— তবুও থেমে নেই তার পথচলা। হেঁটে চলার একমাত্র ভরসা পা-ই যেন হয়ে উঠেছে তার শক্তি, তার সাহস। সেই পা দিয়েই এগিয়ে নিচ্ছেন জীবনের প্রতিটি ধাপ। অসংখ্য সীমাবদ্ধতার মাঝেও দমে যাননি তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর স্বপ্নকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছেন লালমনিরহাটের মেধাবী শিক্ষার্থী আরিফা খাতুন- এক অনুপ্রেরণার নাম।
পা দিয়ে লিখেই এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে এখন মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ,- তার জীবনের প্রতিটি ধাপই যেন এক একটি সংগ্রাম আর জয়ের গল্প। জন্মগতভাবে তার দুই হাতই অচল থাকায় অন্যদের মতো বেঞ্চে বসে লিখতে পারেননি। কিন্তু পা দিয়ে সুন্দর ও স্পষ্টভাবে লিখে পরীক্ষা দিয়ে সবাইকে বিস্মিত করেন তিনি। পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বশীলরা তার মেধা ও লেখার দক্ষতায় মুগ্ধ হন।
বিজ্ঞাপন
জানা যায়, আরিফা লালমনিরহাট পৌর এলাকার উত্তর সাপটানা শাহীটারী এলাকার বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় ব্র্যাক স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৪২৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে ফুলগাছ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৪৪ অর্জন করেন। পরে লালমনিরহাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন আরিফা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল, এসএসসিতেও ভালো ফল করবে সে এবং সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেও সক্ষম হয়।

আরিফার মা মমতাজ বেগম জানান, পাঁচ সন্তানের মধ্যে আরিফা সবচেয়ে ছোট। জন্ম থেকেই তার দুই হাত অচল। দারিদ্র্যের কারণে যথাযথ চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। তবুও ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। তার বাবা আব্দুল আলী একসময় শহরের ফুটপাতে তালা-চাবির কাজ করে এক সময় জীবিকা নির্বাহ করতেন। চার বছর আগে তিনি মারা যান। আরিফার মা অভাবের সংসারেও মেয়ের আগ্রহ দেখে তাকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে বাসায় টিউশনি করে নিজে মা-মেয়ের সংসার কোনো রকম চলছে।
এসএসসি পেরিয়ে আরিফা ভর্তি হন মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে লালমনিরহাট সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অর্নাসে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে আরিফা শুধু একজন শিক্ষার্থী নন, বরং এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। পা দিয়ে তার লেখা এতটাই সুন্দর ও পরিপাটি যে অনেকেই বিস্মিত হন। প্রতিটি অক্ষরে ফুটে ওঠে তার অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস।

আরিফার স্বপ্ন- লেখাপড়া শেষ করে একজন শিক্ষক হওয়া এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী জীবন গড়া। পাশাপাশি তিনি একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও সমাজে অবদান রাখতে চান।
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মাস্টার্স পরীক্ষার হলরুমে দায়িত্বে থাকা প্রভাষক রাজু আহমেদ বলেন, আরিফা কে আমি প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকে চিনি, সে অনেক মেধাবী ও তার হাতের লেখা অনেক চমৎকার। শরীরে দুটি অপারেশন হওয়াতে কিছুটা শরীরে প্রভাব পড়ে, তারপরও সে অদম্য আত্মবিশ্বাস, তা নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সফল হবে।

একই কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর দেলোয়ার হোসেন প্রধান জানান, এরকম একজন প্রতিবন্ধী শারীরিক সমস্যায় ন্যুহ না হয়ে সে দেশ ও জাতির জন্য কিছু করতে চান। অদম্য ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সে প্রমাণ করেছে। আমাদের শিক্ষা পরিবারের সর্বোচ্চ কর্তা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তার দিকে দৃষ্টি দেন, তাকে এগিয়ে নেয়ার উচ্চ শিক্ষার বিষয়ে আরেকটু হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে আরিফা দেশ ও জাতির একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রোকসানা পারভীন বলেন, এ ধরনের অদম্য শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারাও দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।
জীবনের প্রতিকূলতা যেখানে অনেককেই থামিয়ে দেয়, সেখানে আরিফা খাতুন দেখিয়ে দিয়েছেন- ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
প্রতিনিধি/এসএস

