ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেছেন, মানুষের জীবনের লক্ষ্য কেবল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী কিংবা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হওয়া নয়; বরং জীবনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রকৃত শান্তি অর্জন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) কাকরাইল ইন্সটিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে দি স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন আয়োজিত বৃত্তি প্রদান ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
মাহমুদ হাসান বলেন, বর্তমান সমাজে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী ভালো চাকরি, আর্থিক স্বচ্ছলতা ও একটি সুন্দর পারিবারিক জীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে, যা স্বাভাবিক ও ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব অর্জনের পরও অনেক মানুষ মানসিক অশান্তিতে ভোগে, পারিবারিক সংকটে পড়ে এবং জীবনের প্রকৃত তৃপ্তি খুঁজে পায় না।
ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, মানুষ তার জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। সত্যিকার শান্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন নিজের ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া ও স্বাধীনতাকে মহান আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা। প্রকৃত স্বাধীনতা মানে ইচ্ছেমতো সবকিছু করা নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলার মধ্যেই রয়েছে মানুষের প্রকৃত মুক্তি ও কল্যাণ।
আরও পড়ুন: গুচ্ছের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আজ, মানতে হবে যেসব নির্দেশনা
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. মাহমুদ হাসান বলেন, আজকের বিশ্বে শক্তির অপব্যবহার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানদের লক্ষ্য করে আঘাত হানা—এসব কর্মকাণ্ড মানবিকতার চরম পরিপন্থী। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মুসলমানরা কখনো অন্ধ শক্তির মাধ্যমে বিশ্বজয় করেনি; বরং ন্যায়নীতি, আদর্শ ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছে।
বিজ্ঞাপন
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর জেরুজালেম বিজয়ের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কিন্তু যখন তারা বিজয় অর্জন করেছে, তখন প্রতিশোধের পথ অবলম্বন করেনি; বরং ক্ষমা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম জয় করার পর শত্রুদের নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে বিরল উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত।
তিনি আরও বলেন, শক্তি বা ক্ষমতার মাধ্যমে অর্জিত জয় কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইতিহাসে দেখা যায়, যারা বলপ্রয়োগ, দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে, তারা একসময় পতনের মুখে পড়েছে। তাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা নয়, বরং ঘৃণা জন্মেছে। অন্যদিকে যারা ন্যায়, সততা, মানবিকতা ও আদর্শকে ধারণ করে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। আদর্শই মানুষের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই তরুণ প্রজন্মকে কেবল ক্ষমতা বা শক্তির পেছনে না ছুটে নৈতিকতা ও আদর্শকে ধারণ করে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, জীবনে সফল হতে হলে শুধু মেধা বা প্রতিভা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সৎ চরিত্র ও নৈতিকতা। একজন ছাত্র যদি মনে করে যে তাকে কেউ দেখছে না, তবুও আল্লাহ তাকে দেখছেন—তাহলে সে কখনো নকল করবে না, মিথ্যা বলবে না কিংবা প্রতারণার আশ্রয় নেবে না। একইভাবে, একজন শিক্ষক, প্রশাসক বা রাষ্ট্রনায়ক যদি এই বিশ্বাস ধারণ করে, তাহলে সে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে এবং কোনো ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত হবে না। এই মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি, অন্যায় ও জুলুম অনেকাংশে কমে আসবে।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সাইফুল ইসলাম প্রধান অতিথির হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এছাড়া অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি, প্রধান আলোচক ও অন্যান্য অতিথিদের মধ্যেও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
এএইচ/এআরএম

