বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, হতাশা ও অভিমানে বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

student
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনক। ছবি: সংগৃহীত

দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে এক নতুন পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালে দেশে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। হতাশা ও অভিমানই এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করে।


বিজ্ঞাপন


প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ২০২৫ সালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা পর্যায়ে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য উঠে এসেছে।

সংগঠনটির মতে, এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। আগের বছরগুলোর তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১০১ জন, ২০২২ সালে ৫৩২ জন, ২০২৩ সালে ৫১৩ জন এবং ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

শিক্ষা স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সর্বাধিক আত্মহত্যা ঘটেছে স্কুল পর্যায়ে—১৯০ জন, যা মোট ঘটনার ৪৭.৪০ শতাংশ। কলেজ পর্যায়ে আত্মহত্যা করেছেন ৯২ জন বা ২২.৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন বা ১৯.১০ শতাংশ এবং মাদরাসায় ৪৪ জন বা ১০.৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

লিঙ্গভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ২৪৯ জন বা ৬১.৮ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ১৫৪ জন বা ৩৮.২ শতাংশ। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। স্কুলে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ এবং কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি—৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী। মাদরাসায় নারী ২৪ জন এবং পুরুষ ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।


বিজ্ঞাপন


সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই পার্থক্য ইঙ্গিত করে যে, কৈশোরে নারী শিক্ষার্থীরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপোড়েন এবং আবেগীয় সংকটে তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান সংকট ও আত্মপরিচয়জনিত চাপ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে হতাশা ২৭.৭৯ শতাংশ এবং অভিমান ২৩.৩২ শতাংশ নিয়ে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হতাশাজনিত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন বা ৫৫.৩৫ শতাংশ এবং পুরুষ ৫০ জন বা ৪৪.৬৫ শতাংশ। অভিমানের ঘটনায় নারী ৫৮ জন বা ৬১.৭০ শতাংশ এবং পুরুষ ৩৬ জন বা ৩৮.২৯ শতাংশ।

আরও পড়ুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যা বেশি ছেলেদের, স্কুলে বেশি মেয়ে

অ্যাকাডেমিক চাপে আত্মহত্যা করেছেন ৭২ জন শিক্ষার্থী, যাদের বেশির ভাগই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের। এ ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীর হার সর্বাধিক, যা শতাংশের হিসেবে ৭০.৮৩। প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন বা ১৩.১৫ শতাংশ, পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন বা ৭.৯৪ শতাংশ, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন বা ৬.২০ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন বা ৩.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার নতুন ঝুঁকি সামনে এনেছে।

সংগঠনটির ভাষ্য, এসব পরিসংখ্যান আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিং ব্যবস্থার ঘাটতি, সামাজিক হেনস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আরও বলা হয়, কেবল সচেতনতামূলক বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও সমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করা নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই চিত্র ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

এম/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর