এই ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা থেকে শুরু করে দাপ্তরিক যোগাযোগ, বিনোদন কিংবা ব্যবসা পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই ফেসবুকের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা যত বেশি বাড়ছে, সাইবার অপরাধী ও হ্যাকারদের নজরও ঠিক ততটাই জোরালো হচ্ছে এই জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটির ওপর। সামান্য কিছু অসচেতনতা কিংবা ভুল পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত হ্যাকাররা সাধারণ মানুষের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হাতিয়ে নিচ্ছে। ঠিক কী কী কৌশলে বা উপায়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়, তা জেনে রাখা প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
১. ফিশিং লিঙ্ক বা ভুয়া লগইন পেজ
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার সবচেয়ে পুরনো এবং প্রচলিত কৌশল হলো ফিশিং। হ্যাকাররা হুবহু ফেসবুকের লগইন পাতার মতো দেখতে সম্পূর্ণ ভুয়া একটি ওয়েবপেজ তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন লোভনীয় অফার, লটারি জেতার খবর কিংবা অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভুয়া আতঙ্ক সৃষ্টি করে মেসেঞ্জারে বা ইমেলে সেই ফিশিং লিঙ্ক পাঠিয়ে দেয়। সরল বিশ্বাসে ব্যবহারকারী যখন সেই লিঙ্কে ক্লিক করে ভুয়া পেজে নিজের আসল মোবাইল নম্বর বা ইমেল এবং পাসওয়ার্ড টাইপ করেন, তখন সেই গোপনীয় তথ্য সরাসরি চলে যায় হ্যাকারদের সার্ভারে।
২. দুর্বল পাসওয়ার্ড এবং ক্রুট্রিপ ক্র্যাকিং
অনেকেই অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অত্যন্ত সহজ এবং সাধারণ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন, যেমন—নিজের নাম, জন্মসাল, ১ থেকে ৮ পর্যন্ত সংখ্যা কিংবা ‘password’। হ্যাকাররা বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার বা ‘ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক’ (Brute Force Attack)-এর মাধ্যমে খুব কম সময়ের মধ্যে এই ধরনের দুর্বল পাসওয়ার্ডগুলো অনুমান করে বা ক্র্যাক করে অ্যাকাউন্ট নিজের দখলে নিয়ে নেয়।
৩. ক্ষতিকর থার্ড-পার্টি অ্যাপ ও গেমের ফাঁদ
ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের ক্যুইজ, আকর্ষণীয় গেম কিংবা ব্যক্তিত্ব যাচাইয়ের নানা অ্যাপ দেখা যায়। খেলার ছলে বা কৌতূহলবশত যখন ব্যবহারকারী এই ধরনের থার্ড-পার্টি অ্যাপগুলোতে প্রবেশ করেন এবং ‘লগ ইন উইথ ফেসবুক’ অপশনে অনুমতি দেন, তখন ওই অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর প্রোফাইল থেকে সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য, ফ্রেন্ড লিস্ট এবং অ্যাকাউন্টের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ অনায়াসেই নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়।
৪. কিউআর কোড স্ক্যানিং এবং সেশন হাইজ্যাকিং
বর্তমানে সাইবার অপরাধীরা অভিনব কায়দায় বিভিন্ন ক্ষতিকর কিউআর কোড ছড়িয়ে দেয়। ব্যবহারকারী কোনোভাবে সেই কোড স্ক্যান করলেই ক্ষতিকর ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে তার ব্রাউজারের একটিভ সেশন বা কুকিজ হ্যাকারদের কম্পিউটারে ক্লোন হয়ে যায়। এর ফলে পাসওয়ার্ড ছাড়াই হ্যাকাররা সরাসরি ইউজারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়।
৫. সিম সোয়াপিং বা ওটিপি জালিয়াতি
অনেক সময় প্রতারকরা মোবাইল অপারেটরদের কোনো ত্রুটির সুযোগ নিয়ে কিংবা ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর মোবাইল নম্বরের সিম কার্ডটি ব্লক করিয়ে একই নম্বরে নতুন সিম বা ই-সিম তুলে নেয়। এর ফলে আসল ব্যবহারকারীর সিমে নেটওয়ার্ক চলে যায় এবং হ্যাকাররা পাসওয়ার্ড রিসেট করে অ্যাকাউন্ট থেকে আসা সমস্ত ওটিপি (OTP) কোড নিজেদের মুঠোয় পুরে ফেলে অ্যাকাউন্ট দখল করে নেয়।
অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখার উপায়:
সাইবার অপরাধীদের এই সমস্ত বিপদজনক ফাঁদ থেকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, সবসময় ইংরেজি অক্ষর, সংখ্যা এবং স্পেশাল ক্যারেক্টার মিলিয়ে একটি শক্তিশালী এবং জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। দ্বিতীয়ত, ফেসবুকের সেটিংসে গিয়ে অবশ্যই টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (Two-Factor Authentication) বা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে রাখুন, যাতে কেউ পাসওয়ার্ড জানলেও ওটিপি ছাড়া লগইন করতে না পারে। তৃতীয়ত, অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো লিঙ্কে কখনোই ক্লিক করবেন না এবং নিজের লগইন তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। সামান্য সতর্কতা এবং সচেতনতাই পারে আপনার মূল্যবান ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি নিরাপদ রাখতে।
এজেড




