নানান সমস্যায় জর্জরিত কুবির মেডিকেল সেন্টার

মো. হাসান কুবি
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২২, ১০:৩৮ এএম
নানান সমস্যায় জর্জরিত কুবির মেডিকেল সেন্টার

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার থাকলেও নেই চিফ মেডিকেল অফিসার। নেই পর্যাপ্ত জায়গা, লোকবল ও ওষুধ। ৭ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য ছোট একটি কক্ষে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।

মেডিকেল সেন্টার কর্তৃপক্ষের দাবি, বারবার চাহিদার কথা জানিয়ে কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দিয়েও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও হাসপাতাল অবকাঠামো, জনবল এবং বাজেট কিছুই পাননি তারা।

২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল। শিক্ষার্থীরা মেডিকেল সেন্টারের সুবিধা ভোগ করছে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি থেকে। প্রথম থেকেই একটি কক্ষেই এর কার্যক্রম চলে আসছে। এছাড়া শুধুমাত্র অফিস সময় পর্যন্ত এটি খোলা থাকে, ফলে রাতে কেউ অসুস্থ হলে ছুটতে হয় কুমিল্লা শহরে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নষ্ট হলে এখন পর্যন্ত ঠিক করা হয়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচ তলায় একটি বড় রুমকে কাঁচের দেয়াল দিয়ে ভাগ করে ডাক্তারদের বসার জন্য ৫ টি, ওষুধ রাখার জন্য ১টি ও ১ জন কর্মকর্তা বসার জন্য একটি রুম বানানো হয়েছে। একইভাবে আরেকটি রুম বানানো হয়েছে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম মতে, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকার কথা ছিল তিনজন কিন্তু রয়েছে একজন, স্টোর কিপার থাকার কথা ছিল একজন কিন্তু একজনও নেই। এছাড়া নার্স থাকার কথা তিনজন, প‍্যাথলজি টেকনিশিয়ান থাকার কথা দুইজন, ফার্মাসিস্ট থাকার কথা তিনজন, ডেন্টাল অ্যাটেন্ডেন্ট থাকার কথা একজন কিন্তু উল্লেখিত পদগুলোর কোনো লোকবলও নেই মেডিকেল সেন্টারে। এছাড়াও অ্যাম্বুলেন্স চালানোর জন্য দুইজন ড্রাইভার থাকার কথা থাকলেও একজনও নেই। মেডিকেল সেন্টারে অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম ডাটা প্রসেসর পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মো. রাজু হাওলাদারের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার বদৌলতে তাকে দিয়ে চালানো হয় ড্রাইভারের কাজ। এমনকি মেডিকেল সেন্টারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ক্লিনারও নেই। এস্টেট শাখা থেকে লোক এনে মেডিকেল পরিষ্কার করাতে হয়।

অপ্রতুল জায়গা ও লোকবলের অভাবের কারণে অল্পতেই শিক্ষার্থীদের ছুটে যেতে হয় কুমিল্লা শহরে। এ নিয়ে রয়েছে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তাওহীদ সানি এ ব্যাপারে বলেন, ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার এরকম হতে পারে কল্পনাও করা যায় না। ছোট একটা রুমে এটার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। নেই কোনো ধরনের পরীক্ষা করানোর সুযোগ। অল্পতেই ছুটে যেতে হয় শহরে। ২৪ ঘণ্টা যাতে মেডিকেল খোলা থাকে সেই ব্যবস্থা করা হোক।’

সবকিছু ছাপিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে রয়েছে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে ৯ জনই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকার বিষয়ে কোনো কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে নৃবিজ্ঞান বিভাগের আকতারুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকার বিষয়ে আমি তেমন কিছুই জানি না। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর এই প্রথম শুনলাম।’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল সেন্টারের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মো. বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রতিটা বিভাগ, দপ্তরে এ বিষয়ে শুরুতেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। এটা নতুন করে জানানোর কিছু নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে ধারণা দেয় তাহলে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রচারণা করার এর চেয়ে বড় জায়গা আর হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে শিক্ষার্থীরা কোনো মানসিক চিকিৎসা নিতে আসলে তারা সম্পূর্ন চিকিৎসাই নিতে পারবে। অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে দ্বারস্থ হতে হবে না। সাম্প্রতিক বছরে আমার কাছে যারা চিকিৎসা নিয়েছে তাদের মধ্যে বেশিভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী। বিয়ে, রিলেশনশিপ, যৌতুক, পরিবারের চাপ, অর্থনৈতিক চাপ এসব কারণে তাদের মধ্যে বিষন্নতা বেশি দেখেছি। ছেলে শিক্ষার্থীরাও আসে কিন্তু সেটা তুলনায় কম।’

সার্বিক বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান খান জানান, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেটুকু সম্ভব শিক্ষার্থীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আমাদের চাহিদা প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন দেখবেন এই বিষয়গুলো দেখবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন, ‘ইউজিসি থেকে মেডিকেল সেন্টারের জন্য ৫ পদ বরাদ্ধ দিয়ে হয়েছিল আগে। সামনে আমরা নতুন পদ চাইবো ইউজিসির কাছে। এছাড়া বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা খুবই কম। তবুও আমরা জায়গা বাড়ানোর চেষ্টা করবো। সামনের প্লানিং কমিটির মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’

টিবি