সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ঢাবিতে চোর সন্দেহে হত্যা: যাদের দিকে অভিযোগের তীর

রুদ্র আসাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

ঢাবিতে চোর সন্দেহে হত্যা: যাদের দিকে অভিযোগের তীর

গতকাল বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার দিকে তোফাজ্জল নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের কিছু শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের কারো কারো রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়।

ঘটনার আগে ওই হলে ছয়টি মোবাইল চুরি হয়। ভবঘুরে এবং হলে বহিরাগত হওয়াতে তোফাজ্জলকে চোর হিসেবে সন্দেহ করে আটক করে শিক্ষার্থীরা। তাকে হলের গেস্টরুমে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং মারধর করেন শিক্ষার্থীদের কয়েকজন। পরবর্তীতে তাকে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে আবারো গেস্টরুম নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন জানার পরেও তাকে ছাড়েননি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা।

যারা অভিযুক্ত

অনুসন্ধান ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, তোফাজ্জলকে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছেন ছাত্রলীগের সদ্য পদত্যাগ করা উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ। মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের আব্দুস সামাদ, ফার্মেসি বিভাগের মোহাম্মদ ইয়ামুজ জামান এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনিস্টিউটের মোত্তাকিন সাকিন। এরা সবাই ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী। 

প্রত্যক্ষদর্শী এক শিক্ষার্থী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দুই-তিনজন মিলেই ওরে ওখানে মেরে ফেলছে। এরা হলেন— মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০-২১ সেশনের মোহাম্মদ সুমন, ওয়াজিবুল, ফিরোজ ও জালাল। এদের মধ্যে সুমন, ফিরোজ এবং জালাল সবচেয়ে বেশি মেরেছে। তোফাজ্জলের হাত বেঁধেছে জালাল। সুমন চোখ বন্ধ করে মেরেছে তাকে, মার খেতে খেতে ও (তোফাজ্জল) পড়ে গেছে।’

3

প্রত্যক্ষদর্শী এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, পরে জালাল এসে আরও মারতে উৎসাহ দেয়; বলে— ‘মার, ইচ্ছামতো মার; মাইরা ফেলিস না একবারে’। এসময় গ্যাস লাইট দিয়ে পায়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। পরে সুমন এসে তোফাজ্জলের ভ্রু ও চুল কেটে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষার্থী বলেন, বুট জুতা পরে এসে তোফাজ্জলের আঙ্গুল মাড়িয়ে দেয় জালাল। আমি বলি, ভাই এগুলো কি করেন? তা শুনে হেসে দেয় জালাল। অনেকবার বলেছি, তারপরও সে বারবার হাতের আঙুল মাটিতে বিছিয়ে মাড়িয়েছে। তাঁর গোপনাঙ্গে লাঠি দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করছে জালাল। অনেক সিনিয়র ভাইয়েরা এসে তাদের ফেরানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ওরা কিছুতেই মানেনি।

অভিযুক্তদের ইতিহাস কেমন? 

ঘটনার পর অনুসন্ধানে নেমে অভিযুক্তদের ইতিহাস জেনেছে ঢাকা মেইল। ১৮-১৯ সেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, বেশি অভিযোগ আসা জালাল মিয়া ছিলেন ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-সম্পাদক। গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদেরকে নির্যাতন করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ছোট ছোট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তুলতেন, দিতেন ‘শিবির’ ট্যাগ। সবশেষ কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। গত বছরও এক চোরকে এরকম নির্মমভাবে প্রহার করে জালাল, তখন ‘সৌভাগ্যবশত’ সেই চোর নিহত হয়নি। 

হলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাচের এ শিক্ষার্থী বলেন, তারপরে নাম আসে গণিত বিভাগের আহসান উল্লাহর। এই আহসান সবচেয়ে উগ্র এবং বেধড়ক পিটুনি দিয়েছিলেন তোফাজ্জলকে। সবশেষ কমিটিতে তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন উপসম্পাদক।

5
ছাত্রলীগের গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন উপসম্পাদক আহসান উল্লাহ

‘অভিযুক্ত আব্দুস সামাদ ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী। সবচেয়ে বেশি প্রহার করলেও কোনও পদে ছিলেন না এই শিক্ষার্থী, তবে ছাত্রলীগের বেশ সক্রিয় ছিলেন তিনি। সামনে কমিটি দেওয়া হলে আশা করা যায় তিনি পদ পেতেন,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রথম আঘাত করেন রাশেদ হাসান অনিক সে-ই এক্সটেনশন বিল্ডিং এ তোফাজ্জলকে নিয়ে যায়। এছাড়াও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে এলোপাথাড়ি পিটাতে থাকা যুবকটিকে মুত্তাকিন সাকিব বলে শনাক্ত করেছেন এই শিক্ষার্থী।

6
ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী শাহরিয়ার কবির শোভন

তাছাড়া রাব্বি, ফিরোজ, মো. সুমন, ওয়াজিবুল, ইয়ামুজ্জামান সকলেই ২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী তারা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলে জানিয়েছেন ফজলুল হক হলের এই শিক্ষার্থী। 

এছাড়াও আরো জড়িত ছিল শাহরিয়ার কবির শোভন, আল হোসাইন সাজ্জাদ। এ দুজনও ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিল। সাজ্জাদ তোফাজ্জলের আঙ্গুলের মাঝে স্ট্যাম্প রেখে তার ওপর শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

4

যা বলছে প্রশাসন

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মামলা করেছি, উপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছি। হলে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে তদন্তের জন্য। তারা আজকের মধ্যে আমাকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। সেটি হয়ে গেলে আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করব এবং যারাই জড়িত থাকবে তাদের ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আমরা তাদেরকে হল থেকে বহিষ্কার করব এবং ডিপার্টমেন্ট থেকে বহিষ্কারের ব্যাপারটিও বিবেচনা করব।

প্রতিবেদক/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর