সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলন ২০১৮ সালের মতোই ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করছে। দিন দিন উপস্থিতি বাড়ছে কর্মসূচিতে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন বন্ধ করতে বারবার বলা হলেও তা গায়ে মাখছেন না শিক্ষার্থীরা। বরং সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডেকে দাবি মেনে নিতে পাল্টা চাপ প্রয়োগ করতে চান আন্দোলনকারীরা। এজন্য আন্দোলন আরও জোরালো করার ইঙ্গিত দিয়েছেন শীর্ষ তিন সমন্বয়ক।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কারা রয়েছেন সেটা নিয়ে অনেকের কৌতূহল রয়েছে। কাউকে কাউকে নিয়ে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনাও। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। আন্দোলন পরিচালনা করতে দেশব্যাপী ৬৫ জনের সমন্বয়ক কমিটি করা হয়েছে। আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেখানে তিনজনের নাম মোটাদাগে উঠে আসছে। তারা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের নাহিদ ইসলাম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আব্দুল্লাহ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সারজিস আলম। তিনজনই ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
ছাত্রলীগ বারবার অভিযোগ করে আসছে আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আন্দোলন করছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সেই অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কোটা আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না তা স্পষ্ট না হলেও এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
আরও পড়ুন
সম্প্রতি গঠিত রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি বা ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্ট ফোর্সের (ডিএসএফ) সদস্য সচিব নাহিদ ইসলাম। তিনি রয়েছেন আন্দোলনের সামনের সারিতে। কর্মসূচিগুলো ঘোষণা করেন তিনি। এছাড়া একই দলের রিফাত রশিদ, আবু বাকের মজুমদারসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আন্দোলনকে পরিচালনা করছেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। এ অর্থে এটি পরিষ্কার যে, কোটা আন্দোলনে ছাত্রশক্তির ব্যাপক সম্পৃক্ততা রয়েছে।

কোটা আন্দোলন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তখন (২০১৮ সালে) আমাদের জন্য এটি ভীষণ কঠিন ছিল। হলে হলে গিয়ে জনসমর্থন আদায় করতে হয়েছে। তারপর বৃহৎ আন্দোলন করা গেছে। এবার এটা নিয়ে তেমন কষ্ট করতে হয়নি। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। কোটা কেন অযৌক্তিক তা সবাইই বোঝেন। তাই অনেকেই ভাবতে পারেন যে, এতে হয়ত ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু আসলে তা নয়।’
কোটা আন্দোলন নিয়ে ছাত্রলীগের ব্যাখ্যা এবং ব্যাপক আকারে ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক মধ্যমপন্থী দল। ছাত্রদের সমস্যা, ছাত্রদের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা কাজ করি। কোটা আন্দোলন ছাত্রদের একটি সমস্যা। ছাত্রদের প্রাণের দাবি। সুতরাং এই প্রাণের দাবিতে গণতান্ত্রিক ছাত্র-শক্তি বসে থাকবে- এটি হতে পারে না। ছাত্রদের যেকোনো আন্দোলনে ক্রান্তিকালে ছাত্রশক্তি থাকবে। এটি আর পাঁচটি সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই।’
আন্দোলনের অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি স্কুল অফ এক্সিলেন্স নামক একটি অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা প্লাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। নানা সময়ে নানা বক্তৃতায় তাকে বলতে শোনা গেছে- 'আমরা লাইব্রেরির লোক, আমরা আন্দোলন কীভাবে করতে হয় তা জানি না। এসব করে আমরা অভ্যস্ত নই, রাস্তায় থাকাটা সুখকর কিছুও নয়। সুতরাং আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’ তার এই বক্তব্যের আলোকে এবারের কোটা আন্দোলনের চরিত্রকে ‘অরাজনৈতিক’ বলা যেতেই পারে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সারজিস ভাই এবং নাহিদ ইসলাম ভাইয়ের সাথে আমার সংযুক্তি, এটাই প্রমাণ করে যে, এই আন্দোলন একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে, একটি সার্বজনীন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। দল মত নির্বিশেষে সব মতের মানুষের নেতৃত্বে এবং অংশগ্রহণ এই আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে।’

আন্দোলন সীমিত হয়ে পড়ছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন আরও বেগবান হবে। এ নিয়ে কোনো চিন্তার কারণ নেই। দিনে দিনে এই আন্দোলন আরও শক্ত অবস্থানে যাবে।’
কোটা আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সারজিস আলম। তিনি অমর একুশে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং তিনি যুক্ত ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে। বিসিএস প্রিলিতেও পাস করেছিলেন। তবে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। সম্প্রতি ছাত্রলীগ তাকে হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীরা একে একে বিভিন্ন হল থেকে যাত্রা করে অমর একুশে হলের দিকে। চাপের মুখে ছাত্রলীগ তখন বাধ্য হয়ে তাকে হলে ফিরিয়ে নেয়।
আদালতের রায় এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিয়ে তাকে একাধিকবার বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। টেলিভিশন টকশোতেও তিনি যাচ্ছেন। এবারের কোটা আন্দোলনের অন্যতম মুখ্য চরিত্র সারজিস আলম। ছাত্রলীগ পরিচয়ের কারণে অনেকেই অনাস্থা জ্ঞাপন করছেন এই নেতার প্রতি। ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন ‘নেতাসর্বস্ব’ আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে আন্দোলনকারীদের অনেকের মনে।

এ বিষয়ে সারজিস আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কারা মঞ্চে থাকছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, স্লোগান দিচ্ছে, তারা আমাদের কাছে ইমপোরট্যান্ট৷ মাথার উপরে বিভিন্ন হাত নিয়ে যেসব পাগলের প্রলাপ কিছু মানুষ বকছেন, তারা এর একটাও প্রমাণ করতে পারলে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য বের করতে পারলে, আন্দোলনের নেতৃত্ব ছেড়ে দেব৷’
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘যেদিন আমাদের এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হবে সেদিন থেকে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' নামে কোনো ব্যানার থাকবে না ৷’
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনও গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মতের মানুষকে নিয়ে। ভিপি নুরুল হক নুর তিনি ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। সেই আন্দোলনের সময় নুর ছিলেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের মুহসিন হলের উপ-মানব উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
প্রতিনিধি/জেবি




