ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) গভীর রাতে কাচ্চি বিরিয়ানি পার্টির আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯, ২০ এবং ২১ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী। অভিযোগ রয়েছে, এই পার্টিতে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। এনিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কাচ্চি বিরিয়ানি পার্টিতে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের নাম-পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক প্লাটফর্মে ছড়িয়ে তাদেরকে বয়কটের ডাক দেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের জানায়, গত ১৮ জানুয়ারি রাতে বুয়েটের ইউআরপি ও আইটিএন ভবনের মধ্যকার গেট দিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী। তারা বুয়েটের কিছু শিক্ষার্থীকে সাথে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে জমায়েত হয় এবং বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করে। পার্টিতে উপস্থিত হওয়া এসব শিক্ষার্থী এর আগে থেকেই ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ক্যাম্পাসে এদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত ও লেখাপড়ায় অনিয়মিত হিসেবে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী রাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই অনুমতি ছাড়া মূল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনা। বুয়েটের স্টিকার লাগানো গাড়ি ছাড়া কোনো গাড়ি বুয়েটে প্রবেশাধিকার পায় না। সেখানে রাতের আঁধারে বুয়েটের পেছনের গেট এভাবে কোনও অজানা প্রাইভেটকারের জন্য খুলে দেওয়া হবে, সেটি সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে না। ঊর্ধ্বতন অনুমতি ছাড়া এই কাজ হতে পারেনা বলে মনে করছেন অনেকেই। এই বিষয়ে স্বয়ং বুয়েট কর্তৃপক্ষের দিকেই সন্দেহের আঙ্গুল তুলেছেন অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পার্টিতে উপস্থিত থাকা এক শিক্ষার্থীর একটি ম্যাসেজ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায় তিনি বয়কট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মামলা দায়ের করেছেন বলে জানায়।
মূল ম্যাসেজে তিনি লিখেন, ‘আমি সৈয়দ আহনাফ মাহমুদ সাদ সকলের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক শিক্ষার্থী আমাকে এবং আমার কয়েকজন বন্ধু, বড়ভাই ও ছোটভাইকে অনলাইনে এবং সম্মুখে যেভাবে লাঞ্ছিত করেছে এবং বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করেছে (মিথ্যা গুজব ও অপবাদ দিয়ে) তার প্রতিবাদস্বরূপ আমরা তাদের নাম উল্লেখ পূর্বক লোকাল পুলিশ স্টেশনে তাদের বিরুদ্ধে মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মামলা দায়ের করেছি। মহামান্য শিক্ষামন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যেই মহামান্য উপাচার্য স্যারকে এ বিষয়ে সরাসরি ফোন কলের মাধ্যমে অবগত করেছেন এবং আমাদের একাডেমিক ও আইনগত সকল সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি এই মামলার আসামির তালিকায় আমার কলেজের বন্ধু এবং সেকশন সি এর প্রাক্তন ক্লাস প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত। আশা করছি যেহেতু মন্ত্রী মহোদয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, তাই খুব শীঘ্রই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে আইনত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে এই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তদারকি করবেন বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। কোতোয়ালি এলাকার মাননীয় পুলিশ কমিশনার এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সাথে আইনি আলোচনা খুব শীঘ্রই (হয়তো আজকেই) সম্পন্ন করবেন।’
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, পার্টিতে অংশগ্রহণ করা অনেক সদস্যদের বিরুদ্ধে এর আগেও এমন অভিযোগ ছিল। কিন্তু এরপরেও তারা এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতকে উপেক্ষা করে গেছে। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ একাডেমিকভাবেও তাদেরকে বয়কট করেছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পার্টিতে উপস্থিত থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দ আহনাফ মাহমুদ বলেন, আমাদের নামে গুজব ছড়ানো হয়েছে। আমাদের একটা পিকনিক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ ব্যাচের কয়েকজন, ২১ ব্যাচের কয়েকজন এবং সিনিয়র কয়েকজন মিলে বুয়েটের ক্যাফেটেরিয়াতে একটা পিকনিকের আয়োজন করেছিলাম। সেটা করার অনুমতিও আমাদের কাছে ছিল। ১৯ ব্যাচের মুরাদ ভাই, আসিফ ভাইরা ওটার আয়োজন করেছিলেন। আমি ওখানে গেস্ট ছিলাম। কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ার আয়োজন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
কাদেরকে নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২১ ব্যাচের যে ছেলেদের সাথে আমাদের খাতির বেশি এবং ১৯ ব্যাচের যে ভাইদের সাথে আমাদের ফেসবুকে পরিচয় আছে তাদেরকে নিয়ে। বলতে পারেন, একটু ভবঘুরে টাইপের ছেলেপেলেদের নিয়ে আমরা এই আয়োজনটা করি।
মেসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া মামলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখানে একটা শব্দে ভুল আছে। ওখানে লেখা আছে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু লেখাটা হবে ‘মামলা করা হবে’। আর বাকি যা কিছু লেখা আছে সব ঠিকঠাক। আমরা এরকম অহেতুকভাবে হেনস্থার শিকার হওয়ার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএসডাব্লিউ এবং উপাচার্য বরাবর দরখাস্ত দিয়েছিলাম। আমাদের কাছে খবর এসেছে শিক্ষামন্ত্রী হয়তো আমাদের বিষয়ে ভিসি স্যারকে অবগত করেছিলেন যে এভাবে সাইবার বুলিং করা হচ্ছে।
পার্টিতে উপস্থিত থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিশু দত্ত চাঁদ বলেন, আমরা খাওয়া-দাওয়া করার জন্য যাই। কিন্তু এটাকে উল্টাপাল্টা করে অনেক কিছু সাজানো হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দফতরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ উপাচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/এমএইচটি




