শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

জীবনযাত্রার মানে লাগাম, হাত পড়েছে সঞ্চয়পত্রে

এইচ রহমান
প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

জীবনযাত্রার মানে লাগাম, হাত পড়েছে সঞ্চয়পত্রে
ফাইল ছবি

করোনা মহামারির কারণে আগে থেকেই দেশে চলছিল অর্থনৈতিক মন্দা। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে চাপে ফেলে দেশের অর্থনীতি। প্রায় এক বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। দেশের বাজারে বেড়েছে প্রায় প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ডলারের। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা উদ্যোগ নিলেও সরকার হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। যার প্রভাব পড়েছে সঞ্চয়পত্রে। সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে কোনো রকম টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

সঞ্চয় পরিদফতরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ কমেছে তিন হাজার ১০৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। একই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার ৪৭১ কোটি ৮২ লাখ টাকার। বিপরীতে পরিশোধ হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৭৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

প্রসঙ্গত, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে সেটিই হলো নিট বিক্রি। অর্থাৎ সরকারি কোষাগারে জমা থাকে ওই অর্থ। সরকার তা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এ কারণে অর্থনীতির ভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আরও পড়ুন: নাজেহাল মধ্যবিত্ত, খাবার কম কিনে পরিস্থিতি সামালের চেষ্টা!

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ। ব্যয়ের সঙ্গে আয় না বাড়ায় জীবিকা নির্বাহ করতে একদিকে জীবনযাত্রার মানে লাগাম টানতে হয়েছে, অন্যদিকে হাত পড়েছে সঞ্চয়ে। অনেকে এখন সঞ্চয় ভেঙে সংসার খরচ মেটাচ্ছেন।


বিজ্ঞাপন


মানুষের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা কমছে কি না তা বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি এবং আমানতের প্রবৃদ্ধি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্রে যথাক্রমে ৩৯৩ কোটি টাকা ও আট কোটি টাকা বিনিয়োগ বেড়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর থেকে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে ভাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে নিট বিনিয়োগ কমেছে ৭০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। শুধু সেপ্টেম্বর নয়, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে যথাক্রমে ৯৬৩ কোটি টাকা, ৯৮৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং ডিসেম্বরে এক হাজার ৪৯০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা নিট বিক্রি কমেছে। অর্থাৎ এখন মানুষ যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে, তার চেয়ে বেশি ভেঙে ফেলছে।

এদিকে, জরুরি আমদানি দায় মেটাতেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবু আটকে থাকছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। ডলার সংকটে আমদানিকারকদের চাহিদা মেটাতে পারছে না বেশিরভাগ ব্যাংক।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) প্রধান নির্বাহী ড. আহসান এইচ মনসুর ঢাকা মেইলকে বলেন, মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদহার কম। সঞ্চয়পত্রে নিয়মে পরিবর্তনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে। যারা অনিয়ম তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

আরও পড়ুন: সর্বজনীন পেনশন নিয়ে যা ভাবছেন অর্থনীতিবিদরা

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশে অধিক মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় মূলত মানুষের ক্রয় সক্ষমতা না থাকা এবং সঞ্চয় ভেঙে ফেলায় আমানতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বহু পরিবার সঞ্চয় ভেঙে তাদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। ব্যাংক খাতে অর্থ কমে যাওয়াসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ বাড়ায় আমানতের ওপর প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল শেষে ব্যাংক খাতে আমানত ছিল ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ৩১ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৯৬৪ কোটি চার লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ৮৬ হাজার ৯৩২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০২২ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা ২০২১ সালের চেয়ে কম। ২০২১ সালে সামগ্রিকভাবে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এইচআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর