অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কাজ করে?

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৪১ পিএম
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কাজ করে?

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতে প্রায়ই সামনে আসে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা আসলে কি ধরনের প্রভাব ফেলে সেটা নিয়ে রয়েছে নানা কৌতুহল। ইতিহাস বলছে— নতুন কোনো ধারণা নয় এটি। এমনও নয় যে গত শতকে আলোচনায় এসেছে। ক্যামব্রিজ ডিকশনারি বলছে— ‘একটি দেশ বা সংস্থার দ্বারা অন্য দেশের অর্থনীতির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ, যেমন একটি আইন বা নিয়মের সেট মানতে বাধ্য করার জন্য এটির সাথে বাণিজ্য করতে অস্বীকার করাই হচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’।

বর্তমান বিশ্বে কোনো সরকার কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তার স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্য কোনো সরকার, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইকোনমিক স্যাংশন বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ধরুন একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের কূটনৈতিকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সমাপ্তি ঘটতে পারে তারও। যেমন- বেশ কয়েকবার উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা। এতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অন্যান্য দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য। তলানিতে পড়েছে উত্তর কোরিয়া ও আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক। মূলত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা অন্যান্য মরণাস্ত্র তৈরির কর্মসূচিকে ব্যাহত করতেই উত্তর কোরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল মার্কিনিরা। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আড়ালে ‘সংযত হও, নয়তো অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করে দেওয়া হবে’-এমন বার্তাই দিয়েছিল তারা।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে পুরোমাত্রায় একটি পররাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দেশ ক্রমাগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে, বাধা দেওয়া যাচ্ছে না। সামরিকভাবে বাধা দিলে অসংখ্য মানুষ হতাহত হতে পারে। তাই তাদের সংযত আচরণে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ব পরিমণ্ডলে দারুণভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশটির। তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে অস্বীকৃতি জানায় বিশ্বের অন্যান্য দেশ। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরও আচরণ সংযত না হলে অনেক ক্ষেত্রে সামরিক আক্রমণ চালানো হয়।

কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশটির অর্থনীতিতে। ধরা যাক, ইথিওপিয়ার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অনেক পণ্য আমদানি করে। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইথিওপিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করলে দেশটি এই নিষেধাজ্ঞার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে পণ্য আমদানি করতে পারবে না। এতে ক্ষতির মুখে পড়বে দেশটির আমদানি বাণিজ্য, পণ্যের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞার কারণে যোগান দিতে না পারায় সংকট তৈরি হবে। এতে সেদেশের চাহিদার কারণে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে বিভিন্নভাবে। যেমন- শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’ কার্যকর করা হয়। আফ্রিকার একটি দেশ, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যে অন্য কোনো দেশ তাদের কাছে অস্ত্র রফতানি করতে পারবে না। কারণ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে চলমান সহিংসতায় রফতানিকৃত অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার অনেক সময় আমদানিকৃত পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়, যেটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আরেকটি রূপ। ২০২০ সালে আমেরিকা ও চীন বেশ কয়েকবার নিজেদের আমদানিকৃত পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছিল। বাড়তি শুল্ক আরোপ করলে পণ্যে দাম বেড়ে যায়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টেকা কঠিন হয়ে পড়ে। তেহরান সংকটকে কেন্দ্র করে আমেরিকা যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তার একটি রূপ ছিল সম্পদ জব্দকরণ। আমেরিকা তার দেশে ইরানি ব্যক্তিদের যত সম্পদ ছিল, সব জব্দ করেছিল। এছাড়া, ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আরেকটি রূপ।

জাতিসংঘ যদি কোনো দেশ বা সংশ্লিষ্ট দেশের একজন নির্দিষ্ট নাগরিক অথবা ব্যক্তির কিংবা তাদের সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে চায়, তবে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করতে হবে। পরিষদের ১৫ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাব গৃহীত হলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব কাউন্সিলে গৃহীত হতে হবে, অতঃপর সেটি কার্যকর হতে হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ত্রিশবারের মতো নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব কার্যকর হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়, আবার কংগ্রেসে নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব পাশের মধ্য দিয়েও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে দ্বিমত আছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তাদের অনেকে মনে করেন— সম্মুখ যুদ্ধ বা সামরিকভাবে আক্রমণ না করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় সংকট সমাধান হলে বিষয়টি মোটেও খারাপ নয়। তবে অনেকের মতে— অনেক সময় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছে। আমেরিকা ও চীনের পাল্টাপাল্টি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় দুই দেশেই আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়েছিল। এতে দুই দেশেরই সাধারণ নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের অনেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, আমেরিকা অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে উত্তর কোরিয়া ঠিকই তাদের পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমা ও নিত্যনতুন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে তারা। 

এইউ