রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। পৃথক অনুসন্ধানে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড নামের দুটি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, কম মূল্যে রফতানি দেখানো এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। প্রতিষ্ঠান দুটির এসব অনিয়মে মোট ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
সিআইসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের গুদামে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের এক শতাংশেরও কম মজুদ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করা দুই হাজার ৮৬২ টন কাপড়ের মধ্যে দুই হাজার ২৩৭ টন বা প্রায় ৭৮ শতাংশের কোনো হদিস দিতে পারেনি। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্ঘাটন হয়েছে। অন্যদিকে, লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে সাত কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে সিআইসি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সিআইসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠান দুটির কারখানা ও গুদাম সরেজমিন পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুদ যাচাই করা হয়। পাশাপাশি আমদানি ও রফতানির তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।
সিআইসির অনুসন্ধানে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় মোট দুই হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। কিন্তু এর মধ্যে দুই হাজার ২৩৭ টন কাপড় কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। রফতানির হিসাবেও এসব কাপড়ের কোনো তথ্য মেলেনি।
পরিদর্শনে পুরো কারখানা প্রাঙ্গণে মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া যায়, যা মোট আমদানির মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি করা কাপড়ের এক শতাংশেরও কম প্রতিষ্ঠানের মজুদে ছিল।
সিআইসি জানায়, যেসব ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রফতানি হয়নি, সেগুলোর মধ্যে ৩০টিতে আমদানি করা কাপড়ের পুরোটাই অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আংশিক রফতানি হওয়া ১০টি ইউডির ক্ষেত্রেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি লিখিত বক্তব্যে গত এক মাসে এ ধরনের কাপড় দিয়ে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রফতানি না করার কথা জানান। তবে বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সংশ্লিষ্ট ইউডিগুলোর বিপরীতে প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪১টি ইউডির আওতায় আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর সময়ের মধ্যে আনা হয়েছে।
সিআইসির হিসাবে, অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধেও বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া, কম মূল্যে রফতানি দেখানো এবং মূসক ফাঁকির একাধিক অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে সিআইসি।
অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির গুদামে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় এক লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড়ের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এসব কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইসি। শুধু এ খাতেই প্রায় ছয় কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্ঘাটন হয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রফতানি করলেও রফতানিমূল্য চুক্তিমূল্যের তুলনায় কম দেখানো হয়েছে। ইউডির বাইরে স্থানীয় ঋণপত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটি চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় বাজার থেকে কিনেছে। এসব কেনাকাটায় মূসক পরিশোধ করা হয়নি। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে তিন কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমেও মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে মোট সাত কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে সিআইসি।
সিআইসি জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে এ ধরনের অভিযান ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
এমআর/এসআই




