বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তিন দিনব্যাপী এ আলোচনায় চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায়ের খসড়া ও কাঠামোগত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনার ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠানের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে উভয়পক্ষ।
গত ২৭ অক্টোবর শুরু হওয়া এই আলোচনা আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব এবং বাণিজ্য সহজীকরণসহ পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক মতবিনিময় করেন।
আলোচনায় ১৩টি ওয়ার্কিং গ্রুপ এফটিএর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের খসড়া পাঠ ও কাঠামোগত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ট্রেড ইন গুডস, ট্রেড ইন সার্ভিসেস, রুলস অব অরিজিন, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা (এসপিএস), বাণিজ্যে কারিগরি বাধা (টিবিটি) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। এসব ক্ষেত্রে উভয় দেশের অবস্থান, সম্ভাবনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন বলেন, প্রস্তাবিত এফটিএ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশটি থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধান আলোচক ড. রাশিদী সাঈদ ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভারসাম্য বজায় রেখে একটি কার্যকর ও ‘উইন-উইন’ চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। পরবর্তী আলোচনায় চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায়ে মতপার্থক্য নিরসন এবং পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এফটিএটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আসিয়ানভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা খাতের বাজার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, শিল্পে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্তাবলি, শুল্কছাড়ের পরিধি, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। এ কারণে চলমান আলোচনায় উভয় দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করে একটি টেকসই ও পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম দফার আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার আলোচনা চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতির পথ উন্মোচন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এমআর/এএম




