ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সংস্কার, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান ড. তিতুমীর।
তিনি জানান, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করতে ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থ লোপাটের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার বলে যে দাবি করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব, সময়কাল ও নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। ফলে যাচাই ছাড়া এ অঙ্ককে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
পাশাপাশি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে ৪২ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কৃষি উপকরণ ও বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে ড. তিতুমীর জানান, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি উন্নত করা গেলে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর সুযোগ বাড়বে।
তিনি আরও জানান, কার্ড চালু করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা, একই পরিবারের একাধিক কর্মসূচি থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত সুবিধা নেওয়া ঠেকানো এবং বাদ পড়া দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
এদিকে, বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খাদ্যসহায়তার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়, বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি উন্নত করা এবং ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও জানান উপদেষ্টা। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে তিনি বলেন, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ ও ২০২৬–২৭—উভয় অর্থবছরেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে জানান ড. তিতুমীর।
একেএস/এআর




