- দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৮২ কোটি ডলার
- সামগ্রিক লেনদেনে ঘাটতি ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার
- আর্থিক হিসাবে ঘাটতি ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার
- চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার
- দুই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৮.৯ শতাংশ
প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও দেশের বৈদেশিক লেনদেনে চাপ বেড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে বাণিজ্য ও আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক লেনদেনেও। এ সময়ে সামগ্রিক লেনদেনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে। তবে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
বাণিজ্য হচ্ছে, একটি দেশ বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে, বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে তার চেয়ে কম আয় করলে যে ব্যবধান তৈরি হয়। অর্থাৎ, কোনো দেশের আমদানি ব্যয় যদি রপ্তানি আয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত অংশকে বাণিজ্য ঘাটতি বলা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি এক সময়ে বিদেশ থেকে ১০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে এবং ৮০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয়ের চেয়ে ২০ কোটি ডলার বেশি। এই ২০ কোটি ডলারই হবে বাণিজ্য ঘাটতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই-আগস্টে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ২৯৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৮৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। একই সময়ে আর্থিক হিসাবেও ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এর বিপরীতে রেমিট্যান্সে এসেছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। প্রথম দুই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৫৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৪৯০ কোটি ডলারের তুলনায় ৯২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বেশি। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। রেমিট্যান্সের এই বাড়তি প্রবাহই বাণিজ্য ও আর্থিক হিসাবে ঘাটতির বিপরীতে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
জুলাই-আগস্টে দেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারের। বিপরীতে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার। ফলে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩৮২ কোটি ডলার। একটি দেশ বিদেশ থেকে পণ্য কেনার পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, বিদেশে পণ্য বিক্রি করে তার চেয়ে কম আয় করলে যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটিই বাণিজ্য ঘাটতি। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দুই মাসে বিদেশ থেকে পণ্য কেনার ব্যয় রপ্তানি থেকে পাওয়া আয়ের চেয়ে ৩৮২ কোটি ডলার বেশি হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি আর্থিক হিসাবেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই-আগস্টে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ১১৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে ৯০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে একটি দেশের সঙ্গে বিদেশের বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের চিত্র পাওয়া যায়। বিদেশি বিনিয়োগ, ঋণ, আর্থিক সম্পদ ও দায়ের মতো বিভিন্ন লেনদেন এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই হিসাবে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট সময়ে বৈদেশিক আর্থিক প্রবাহের তুলনায় অর্থের বহির্গমন বা দায় পরিশোধের চাপ বেশি ছিল।
এদিকে বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবেও ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেনে ঘাটতি হয়েছে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
তবে এই চাপের মধ্যেও চলতি হিসাবের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। জুলাই-আগস্টে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত বেড়েছে ৪০ কোটি ২০ লাখ ডলার।
চলতি হিসাবের এই উদ্বৃত্তের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স। কারণ একটি দেশের পণ্য ও সেবা বেচাকেনা, প্রবাসী আয়সহ নিয়মিত বৈদেশিক আয়-ব্যয়ের হিসাবই মূলত চলতি হিসাবে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের মতো রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৯০ কোটি ডলার। ফলে দুই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৯২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
সার্বিকভাবে প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যানে দেশের বৈদেশিক খাতে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। রেমিট্যান্স ও চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু একই সময়ে আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে এবং আর্থিক হিসাবেও বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বৈদেশিক খাতের এই ভারসাম্য ধরে রাখতে সামনে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি চলতি হিসাবে স্বস্তি দিলেও বাণিজ্য ও আর্থিক হিসাবের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে চাপ আরও বাড়তে পারে।
টিএই/এএস




