* প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে আটকে থাকার পূর্বাভাস
* দারিদ্র্যে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ
* খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৩.২ শতাংশ
* রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ
* নারীদের কর্মসংস্থান কমেছে, চাকরি সৃষ্টি স্থবির
* অর্ধেক দরিদ্র পরিবার সামাজিক সুরক্ষার বাইরে
* সংস্কার সফল হলে ২০২৮ সালে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ফেরাতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে জ্বালানি ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে গতি এলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, বিনিয়োগ কার্যক্রম দুর্বল হয়েছে, রফতানির গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। একই সময়ে সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার কারণে সরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শক্তিশালী প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থেমে গেছে এবং নারীরা চাকরি হারিয়েছেন।
এ সময়ে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। ফলে প্রয়োজনীয় খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
দারিদ্র্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকির ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। বিশ্বব্যাংকের মতে, সুবিধাভোগী নির্বাচন আরও কার্যকর করতে পারলে সীমিত সরকারি অর্থ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব।
এক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি কার্যকর করা ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মাধ্যমে তথ্যভিত্তিকভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সুবিধাভোগী অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করে পারিবারিক কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচি আরও কার্যকর লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে অঞ্চলটির অর্থনীতিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখছে। তবে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক চাপ বাড়ার কারণে প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি এড়িয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার করতে হবে। দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা এবং বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে অঞ্চলটির নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, দ্রুত সম্প্রসারিত বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখনো কম। তবে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে এটি ব্যবহার করছে। সরকারগুলোও জনসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শুরু করেছে। এর মধ্যে ভারতে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় চোখের রেটিনা পরীক্ষার মতো উদ্যোগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঞ্জিস্কা ওহন্সর্জে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রফতানির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সরকারি সেবা উন্নত করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের গতিপথ বদলে যেতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন মৌলিক ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে।
এএইচ/এফএ




