বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
তিনি বলেছেন, ‘এই পরিবর্তন ঠেকাতে উন্নত দেশগুলো বাজারে হস্তক্ষেপ ও শুল্কের মতো যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা টেকসই নয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধান কাজ বিশ্বজুড়ে নিজেদের মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের আয়োজন করা হয়েছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর নতুন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের স্থানান্তর। পণ্য বাণিজ্যে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার কারণে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মূলধনের উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ায় সহায়তা বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) জন্য এখন আর শুধু পশ্চিমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। বিকল্প উৎস তৈরি হয়েছে। এর ফলে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কম আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
বাণিজ্যের চিত্রও পরিবর্তিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে এশিয়ার অধিকাংশ দেশের বাণিজ্য পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তেল রপ্তানিকারক পশ্চিম এশীয় দেশসহ প্রায় সব এশীয় দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এশিয়ার মধ্যেই। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারও এখন পশ্চিমে নয়। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে ৭০টির প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন।’
প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পেটেন্ট এবং গবেষণাপত্র প্রকাশ, দুই ক্ষেত্রেই চীন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে মূলধন স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীও এখন চীন। সহায়তা, ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধায় এই অবস্থান আগে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের।’
রেহমান সোবহান বলেন, ‘এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে আরও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিমেরু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য করা উন্নত দেশগুলো এই পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা নতুন শক্তিগুলোর বাজারে প্রতিযোগিতা করে নয়, বরং হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তা করছে। এতে বাণিজ্যব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বাড়ছে এবং উপনিবেশিক বাণিজ্য মডেলেরও প্রত্যাবর্তন দেখা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনীতির অস্ত্রীকরণ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু ইউরোপীয় দেশ নিজেদের বাজারকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। শুল্কের চাপে অনেক দেশকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ভারতের ওপরও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক চাপ ও শুল্ক ব্যবস্থার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।’
এই পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থের দিক থেকেও টেকসই নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, কোনো দেশকে নিজের বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ দিতে বা নিজের পণ্য কিনতে বাধ্য করার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলকভাবে সেই পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। স্বাভাবিক বাজারে ক্রেতাদের যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে পণ্য কিনতে আগ্রহী হওয়ার কথা।
উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ম্যাককিনলির সুরক্ষাবাদী নীতির মতো বাজার সুরক্ষিত করে ক্ষয়িষ্ণু শিল্পভিত্তি পুনরুজ্জীবনের ধারণা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমাগত আক্রমণ ও ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অনেকটাই প্রান্তিক হয়ে পড়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠিত অনেক নিয়ম নিয়মিত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তবে এসব পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া থামাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, এশিয়া ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে এবং নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবেও ভবিষ্যতে ছাড়িয়ে যাবে। চীন এশিয়ার জন্য মূলধন রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মূল্যশৃঙ্খল গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশের করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধ, সেখানকার অস্থিরতা এবং বিভিন্ন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশকে ছোট খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হলেও এটি বাংলাদেশকে নমনীয়তা দেয়। বাংলাদেশের স্বার্থ এমন একটি স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে বাইরের শক্তিগুলো এসে দেশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত করবে না।
এমআর/এএইচ/এএম




