বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

‘নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে’ অসহায় ভোক্তা, ১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার আড়াই হাজারে

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

‘নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে’ অসহায় ভোক্তা, ১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার আড়াই হাজারে

রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও চুলায় ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। ফলে রান্নার জন্য দিন দিন বাড়ছে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা। কিন্তু সেই বিকল্প জ্বালানিতেও এখন স্বস্তি নেই। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও সময়মতো মিলছে না সিলিন্ডার। ফলে একদিকে গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে এলপিজির বাড়তি দাম-দুই দিকের চাপে পুড়ছে সাধারণ ভোক্তার পকেট।

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা আকলিমা বেগম তিন বছর ধরে সেখানে ভাড়া থাকেন। বাসায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও রান্নার কাজে সেই গ্যাসের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই তার। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও চুলায় গ্যাস মিলত না। কখনো কখনো গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো গ্যাসের জন্য। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়েছেন তিনি।

শুরুর দিকে বাড়িওয়ালাকে নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করলেও পরে বাসাভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বিলের পুরো অর্থ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাতে অবশ্য গ্যাসের সংকট কাটেনি। বরং নগরজীবনে রান্নার কাজে এলপিজি এখন আকলিমা বেগমের মতো লাখো পরিবারের প্রায় অপরিহার্য জ্বালানি হয়ে উঠেছে।

আকলিমা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এক সময় আমরা গ্রামে মাটির চুলায় রান্না করতে দেখেছি। কিন্তু শহরে সেই সুযোগ নেই। বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস না পাওয়ায় মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালের পর নতুন গ্যাস সংযোগও বন্ধ। যেসব সংযোগ আছে, সেসব গ্রাহকই ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছে না।’

তার প্রশ্ন, ‘শহরে প্রতিনিয়ত ঘরদোর ও দালানকোঠা বাড়ছে, বাড়ছে মানুষের সংখ্যাও। তাহলে রান্নার গ্যাসের বিকল্প কী?’

অন্যদিকে, ইন্ডাকশন বা বৈদ্যুতিক চুলাও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে পাইপলাইনের গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে যারা এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের সামনে এখন নতুন সংকট—সিলিন্ডার মিললেও তা নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না।

১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার ২৫০০! 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত।

অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কোথাও কোথাও ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আবার বেশি দাম দিয়েও অনেক জায়গায় সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও এক-দুই দিন আগে অর্ডার দিয়ে রাখতে হচ্ছে। কোথাও আবার দোকান থেকে জানানো হচ্ছে, সরবরাহ এলে সিলিন্ডার দেওয়া হবে।

বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যে বড় প্রশ্ন উঠছে-দেশে সত্যিই এলপিজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, নাকি সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে?

সরকার ও এলপিজি আমদানিকারকরা বলছেন, দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি ভালো। কিন্তু বাজারের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

আমদানি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওই মাসে এলপিজি আমদানি করে।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। অর্থাৎ মাসের পুরো হিসাব না হলেও আগের মাসের তুলনায় আমদানির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের মোট আমদানি আগস্টের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

যদিও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক সভায় এলপিজি অপারেটররা দাবি করেছেন, দেশে এলপিজির সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে এবং বর্তমানে কোনো ধরনের সংকট নেই।

কিন্তু আমদানি কমার তথ্য, কার্গো না পাওয়ার অভিযোগ এবং খুচরা বাজারে সিলিন্ডারের বাড়তি দাম—এই তিনটি বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সংকট না থাকলেও সিলিন্ডার মিলছে না কেন? 

এলপিজি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিলিন্ডারজাতকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে নিয়মিত এলপিজি আমদানি করে মূলত ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান।

বিইআরসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছিল। এবারও আমদানি কমতে শুরু করায় বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারও বলছে, দেশে এলপিজির সংকট নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে বলেছেন, দেশে এলপিজি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কোথাও এলপিজির ঘাটতি দেখা দিলে তার কারণ এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে হবে। কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

gas_2প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও জানিয়েছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে এলপিজি মজুত করে জনঅসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন।

বাজারে দাম বাড়ছে কেন?

আমদানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় কার্গো সংকট তৈরি হয়েছে। বেড়েছে জাহাজভাড়াও।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি রয়েছে, তারাও চুক্তিকৃত পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম সরবরাহ পাচ্ছে। খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকেও কার্গো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংগঠনটির দাবি, বিইআরসির মূল্য নির্ধারণে যে ১৬০ ডলার আমদানি প্রিমিয়াম ধরা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে সেটি বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করলে আমদানিকারকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রেজা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কার্গোর অপ্রাপ্যতা। আগে একটি পথ বন্ধ থাকলেও অন্য পথ খোলা থাকত। কিন্তু এখন লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি দুটি পথই মারাত্মকভাবে ব্যাহত। ফলে কোনো বড় এলপিজি কার্গো আসতে পারছে না।’

তার দাবি, বিকল্প পথে ওমান, মালয়েশিয়া কিংবা নরওয়ে থেকে ছোট আকারে কিছু সরবরাহ পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল ও অনিয়মিত।

আবু সাঈদ রেজা বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চুক্তিকৃত পণ্যের ২০ শতাংশ সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে। আর যাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই, তাদের জন্য খোলা বাজার থেকে এলপিজি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব।’

আমদানিকারক ও ডিলারদের অভিযোগ ভিন্ন

এলপিজি সরবরাহ সংকটের জন্য আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করলেও ডিলার ও পরিবেশকদের নিয়ে তাদের অভিযোগ রয়েছে।

লোয়াব মহাসচিব আহসান জব্বারের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্য বেড়েছে এবং জাহাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক অপারেটর সময়মতো কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না।

তার অভিযোগ, সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার ও পরিবেশক গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার মজুত করছেন এবং বেশি দামে বিক্রি করছেন।

তবে ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানায়, তিন দিন আগে একটি কোম্পানির এলপিজি আনতে ট্রাক পাঠানো হলেও জানানো হয়, গ্যাস পেতে অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘একটি ট্রাক প্ল্যান্টে গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য এক দিন অপেক্ষা করলে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। এই বাড়তি খরচ তো গ্যাস বিক্রি থেকেই তুলতে হবে।’

অর্থাৎ সংকটের দায় নিয়ে বাজারে এখন কার্যত তিন ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে সংকট নেই, আমদানিকারকরা বলছেন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়েছে, আর ডিলারদের অভিযোগ কোম্পানিগুলোই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।

এর মধ্যে সাধারণ ভোক্তার কাছে অবশ্য এসব তর্কের কোনো মূল্য নেই। তার প্রয়োজন শুধু নির্ধারিত দামে একটি সিলিন্ডার।

বাড়তি টাকাতেও মিলছে না গ্যাস

যাত্রাবাড়ীর পুরি-পেঁয়াজু বিক্রেতা তাকদীর আহমেদ জানান, চলতি মাসের শুরুতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। খরচ বাড়ে কিন্তু ইনকাম আগের জায়গায়ই। কারণ হঠাৎ পেঁয়াজু, বেগুনি, পুরির দাম বাড়ালে কেউ কিনবে না। 

শনিরআখড়ার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। অনেজ দোকান ঘুরে ২৪৫০ টাকায় পেয়েছি।’

কাতারের এলএনজি বন্ধের খবরে নতুন শঙ্কা

এলপিজির বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে কাতারএনার্জি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিশের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি দেশ নির্ধারিত সময়ে এলএনজি কার্গো না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

বাজার বিশ্লেষক সংস্থা আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে কাতার যেখানে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো পাঠিয়েছিল, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তা নেমে এসেছে মাত্র ১৮টিতে।

এলএনজি ও এলপিজি আলাদা জ্বালানি হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে এই আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের গ্যাস ও রান্নার জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর।

সরকারি এলপিজি আমদানির উদ্যোগও থমকে

এলপিজি বাজারে বেসরকারি খাতের আধিপত্যও সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশই বাসাবাড়ির রান্নায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ বেসরকারি খাতের হাতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ মাত্র প্রায় ১ শতাংশ।

গত বছরের ডিসেম্বরেও বেসরকারি খাতের আমদানি কমে যাওয়ায় এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছিল। এরপর সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়।

গত ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে তিন শর্তে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দফায় সরবরাহকারী খোঁজা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি।

Gas_Water

পরে ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করলে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তাদের কাজ দেওয়া হয়। তবে সেই এলপিজি কবে দেশে পৌঁছাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ বাজারে সংকট দেখা দিলে সরকারি পর্যায় থেকে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর যে সক্ষমতা প্রয়োজন, সেখানেও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

অক্টোবরেও দাম বাড়ার শঙ্কা

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কয়েকটি কোম্পানির নির্ধারিত কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় সেপ্টেম্বর মাসে বাজারে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।

তিনি সতর্ক করেছেন, নৌপথের জটিলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের কারণে প্রয়োজনীয় কার্গো দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে অক্টোবর মাসে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এই আশঙ্কাই এখন ভোক্তাদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ। কারণ অক্টোবরের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, আমদানি খরচ এবং কার্গো সংকট কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অক্টোবরের দাম বাড়ার প্রত্যাশায় কোনো কোনো কোম্পানি বা মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে সরবরাহ কমিয়ে থাকতে পারে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ হয়নি।

এলপিজির বাজারে সংকটের কারণ নিয়ে সরকার, আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় মিল আছে—চাপটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। যাদের পাইপলাইনের গ্যাস নেই, তাদের বিকল্প নেই। যাদের পাইপলাইনের গ্যাস আছে, তারাও অনেক সময় পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এলপিজির মতো সংবেদনশীল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম সংকটের এই সময়ে সরকার বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এই সংকট যেন সংশ্লিষ্টদের যথেষ্টভাবে জাগ্রত করতে পারছে না। অথচ আমদানিকারকরা জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ২৩ জন আমদানিকারকের মধ্যে বর্তমানে ৭ থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে টিকে আছে এবং তাদের কাছে কিছু মজুত রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) যেন এলপিজির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে। তাহলে ১ অক্টোবর থেকে নতুন নির্ধারিত দামে বর্তমানে যে মজুত রয়েছে, তা দিয়ে সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হবে।’

সাজ্জাদুল করিম বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, বিষয়টি আর বিলম্ব না করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হোক। কার দোষ, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি পরে তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো।’

তিনি আরো বলেন, ‘১ অক্টোবরের মধ্যে বিইআরসি নতুন মূল্য ঘোষণা করলে সংশ্লিষ্টরা স্বাভাবিকভাবে বিপণন কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন। এতে অন্তত নতুন দামে এলপিজি বাজারে সরবরাহ করার সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের অন্যান্য সংকটের মধ্যেও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় এই পণ্যটি পেতে পারবেন।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘লাইনের গ্যাসে যখনই সংকট তৈরি হয়, তখনই এলপিজির চাহিদা বাড়ে। আর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দীর্ঘদিন ধরে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। কিন্তু নির্ধারিত দামে বাজারে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিইআরসি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কার্যকর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এলপিজির বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বেশি দাম দিলে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, আর নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারকে যদি এভাবে ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তারা নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। ভোক্তারা কোনো জায়গা থেকে সহায়তা না পেয়ে অসহায়ভাবে তাদের কাছ থেকেই পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।’

নাজের হোসাইন বলেন, ‘সমস্যাটি শুধু এলপিজির ক্ষেত্রে নয়। মুদি, কসমেটিকস, টয়লেট্রিজসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়ছে। তেলের দাম বাড়ার পর আটা, সুজি, চিনি, চাল, পোলাওয়ের চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ানোর আগে বাজারে সংকট দেখা যায়। দাম বাড়ানোর পর আবার সেই সংকট থাকে না, পরিবহনেও আগের মতো লাইন দেখা যায় না। একইভাবে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও দাম বাড়ানোর আগে সংকটের কথা বলা হয়, কিন্তু দাম বাড়ানোর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এতে প্রশ্ন ওঠে, ব্যবসায়ীরা কি আগে থেকেই পণ্য মজুত করে রাখেন এবং দাম বাড়ানোর পর তা বাজারে ছাড়েন?’

ক্যাবের সহসভাপতি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের কথা বলা হলেও সরকার কেন কার্যকরভাবে তা ভাঙতে পারছে না, সেটি বড় প্রশ্ন। বাজারে এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই এর খেসারত দিতে হচ্ছে।’

এমআর/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর