বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

প্রবৃদ্ধি কমে বাড়বে মূল্যস্ফীতি: বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এডিবির শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রবৃদ্ধি কমে বাড়বে মূল্যস্ফীতি: বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এডিবির শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট ও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। 

সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছে সংস্থাটি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) আপডেট’-এ এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি।

এডিবি বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও উচ্চ খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণের উচ্চ সুদহার এবং সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ বেসরকারি খাতের অর্থায়ন আরও সংকুচিত করছে।

এর প্রভাব পড়ছে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির সঙ্গে ব্যাংক খাতের সংকট যুক্ত হয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

শিল্প প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে

এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা শিল্প খাতের ওপর চাপ তৈরি করবে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন বিনিয়োগের অনুমোদন ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে এডিবি।

সংস্থাটির মতে, এসব সমস্যা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করা হলেও এর সুফল অর্থনীতিতে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হবে।

মূল্যস্ফীতিও উঠতে পারে ৯ শতাংশে

প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

জ্বালানি, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

এডিবির মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়তে পারে।

সম্প্রতি ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানোর বিষয়টিও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে সড়ক ও পণ্য পরিবহন এবং নৌযানের ভাড়া বাড়লে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়ও বাড়তে পারে।

কৃষিতেও বাড়ছে ঝুঁকি

আবহাওয়াজনিত ধাক্কা ও সারের সীমিত প্রাপ্যতার কারণে কৃষি উৎপাদনেও চাপ তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য বাজারজাত ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে খাদ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থাৎ জ্বালানি থেকে পরিবহন এবং কৃষি থেকে খাদ্য পর্যন্ত অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ধারাবাহিক চাপ তৈরি হতে পারে।

ভোগ ও প্রবাসী আয়ই ভরসা

এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি থাকবে ব্যক্তিগত ভোগ। প্রবাসী আয় বাড়ায় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে।

তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সেই আয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার একটি বড় অংশ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে আয় বাড়লেও পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বাড়লে প্রকৃত ভোগক্ষমতা খুব বেশি বাড়বে না।

রেমিট্যান্সের প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করলেও বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছে এডিবি।

বিনিয়োগে চার বাধা

উচ্চ সুদের হার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি ঘাটতি ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকটকে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে এডিবি।

সরকারি বিনিয়োগ থেকেও খুব বেশি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারি বিনিয়োগের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।

এডিবির মতে, অর্থনীতিতে চাহিদা থাকলেও সেই চাহিদা অনুযায়ী নতুন কারখানা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ না হলে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো কঠিন হবে।

ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে রফতানি

বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়বে না বলে মনে করছে এডিবি। বৈশ্বিক বাজারের দুর্বল চাহিদা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা রফতানি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে জ্বালানি ও শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি বাড়ায় মোট আমদানিও বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদনের প্রয়োজন মিটলেও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিষেবা খাতে কিছুটা স্বস্তি

শিল্প ও কৃষিতে চাপ থাকলেও পরিষেবা খাত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি। আগামী অর্থবছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।

প্রবাসী আয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদার কিছুটা পুনরুদ্ধার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার কারণে পরিষেবা খাত এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

সব মিলিয়ে এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একই সঙ্গে কম প্রবৃদ্ধি ও বেশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উঠে এসেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা না গেলে অর্থনীতির গতি ফেরানো কঠিন হতে পারে।

এমআর/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর