মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘বছরজুড়ে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদার হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

‘বছরজুড়ে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদার হবে’
সচিবালয়ে নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মূল্য পরিস্থিতি ও সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় কথা বলছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

রমজানকেন্দ্রিক নয়, সারা বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি জোরদার করার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। 

তিনি বলেছেন, বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে কেউ অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, উৎপাদক ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মূল্য পরিস্থিতি ও সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কেউ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

মন্ত্রী বলেন, রমজান মাসে নিত্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তবে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা শুধু রমজানকেন্দ্রিক নয়। সারা বছরই পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম সহনীয় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির কারণ তুলে ধরে আব্দুল মুক্তাদির বলেন, গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবও কয়েকটি এলাকার বাজারে পড়েছে। তবে সামনে শীতকাল হওয়ায় নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের দামে দুই-চার টাকার অস্বাভাবিক ওঠানামা সামগ্রিক হিসাবে বড় মনে না হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ভোক্তাদের আস্থা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, বাজারে নজরদারি ও মনিটরিং বাড়াতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় করা হবে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে এর অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশকেও বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একসঙ্গে না দিয়ে একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপরও চাপ পড়ে। তাই জ্বালানির দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে। একইসঙ্গে দেশে উৎপাদিত পণ্য এবং যেসব পণ্যের এলসি খোলা হয়েছে বা জাহাজীকরণের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মসুর ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন।

ভোজ্যতেলের কাঁচামাল সিড আমদানিতেও বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ে ২ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন সিড আমদানি হলেও চলতি বছর তা বেড়ে ৩ লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা তৈরি হয়। কমিশনের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ও পাইপলাইন পরিস্থিতি ইতিবাচক রয়েছে।

বাজারে পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ট্রেসেবিলিটি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ডিম ও পোল্ট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে এ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বাজারে পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যৌক্তিক মূল্য বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের আস্থা শক্তিশালী করা। এ জন্য সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ী নেতাদের পরামর্শ বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভায় ব্যবসায়ী নেতারা নিত্যপণ্যের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সরবরাহ ও বাজারমূল্য নিয়ে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে পরামর্শ দেন।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এমআর/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর