ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সারাদেশে ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি আরও জোরদার করার পাশাপাশি ভেজালবিরোধী কার্যক্রম, পণ্যমূল্যের তালিকা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটি জানিয়েছে, ভোক্তাদের সংগঠিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করাও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাবের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়কালের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ক্যাবের নির্বাহী পরিচালক আহম্মদ একরামুল্লাহ প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন।
আহম্মদ একরামুল্লাহ বলেন, ক্যাবের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলছি। ৬০টি জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তরুণদের সম্পৃক্ত করে কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ‘পাওয়ার ইন এআই’ এর সঙ্গেও ক্যাব যুক্ত হয়েছে। শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং দেশের বিভিন্ন বিভাগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ঠিক এক বছর আগে ক্যাবের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশের সময় আমরা জাতির কাছে শপথ করেছিলাম— ভোক্তার পক্ষে কাজ করে যাব। সেই সময় আমরা ১৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, একটি সংগঠন পরিচালনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। ক্যাবের পূর্ববর্তী অনেক কমিটি নিষ্ক্রিয় ছিল। বর্তমানে সেগুলোকে অনেকটা সক্রিয় করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা কমিটিগুলোও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ক্যাবের গঠনতন্ত্র নিয়েও কাজ চলছে।
ক্যাব সভাপতি বলেন, ক্যাবের মূল ফোকাস ভোক্তা অধিকার। একই সঙ্গে পরিবেশ ও নদীদূষণের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করছি। দেশের ১৮ কোটি মানুষের ভোক্তা অধিকার নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে চাই।
তিনি জানান, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর সঙ্গে নতুনভাবে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে।
ক্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রসঙ্গে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমাদের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। নিজস্ব কার্যালয় থাকলে আমরা আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারব। এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তহবিল বৃদ্ধির জন্যও কাজ চলছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এক কোটি টাকা পাওয়া গেছে।
ভোক্তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে ক্যাব সভাপতি বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত হতে চাই না।
উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান GAIN, ESDO-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে ক্যাবের কেউ হুমকির শিকার হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্যুতের অতিরিক্ত মূল্য নিয়ে আমরা শুনানি করেছি। আমাদের দাবি ছিল বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা; কিন্তু এ বিষয়ে এখনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এসব বিষয়ে সরকারের ওপর আমরা চাপ প্রয়োগ করতে চাই।
তিনি জানান, সারাদেশে ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনা করছে ক্যাব। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তরুণদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুশ্রম প্রতিরোধেও কাজ চলছে।
শিশুশ্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশু শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে ESDO-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে ক্যাব সভাপতি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনের সক্ষমতা বাড়ানো, ভোক্তাদের সংগঠিত করা এবং বাজারে ভেজাল পণ্য প্রবেশ ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভেজালবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পণ্যমূল্যের তালিকা নিয়েও কাজ করা হবে।
এ ছাড়া ক্যাবের প্রকাশনা ‘ভোক্তা কণ্ঠ’ নতুন রূপে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন ধরনের কাজে ক্যাবকে সম্পৃক্ত করা হয়। বিমানবন্দরে মালামাল চুরির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও আদালতের মাধ্যমে ক্যাবকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের বন্ধু বা শত্রু নই; আমরা অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কাজ করতে চাই।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, প্রচার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের মন্ডল প্রমুখ।
এমআর/এফএ




