বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

তামাক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হলো তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর বাড়িয়ে এর সহজলভ্যতা এবং ব্যবহার কমিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জনে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপ পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। 

দেশের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগামী অর্থবছর থেকে সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ‘ইকোনোমিক্স অব ট্যোবাকো ট্যাক্সেশন : পাবলিক হেলথ পার্সপেকটিভ’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। 

গত ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রশিক্ষণের সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক। 

প্রশিক্ষণের প্রথম দিনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব কর্মকর্তা এসকে তরিকুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এসএম আব্দুল্লাহ। 

তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাডভেলরেম করারোপ পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট করারোপ এবং কিছু ক্ষেত্রে মিশ্র পদ্ধতিতে করারোপ করা হচ্ছে। এর ফলে সরকার রাজস্ব থেকে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারও কমাতে পারছে।

তারা বলেন, বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর করের হার বর্তমানে অনেক বেশি হলেও কর কাঠামোর কার্যকারিতা কম থাকায় তামাকসেবীর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না। তাই রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি বন্ধ করতে দ্রুত সুনির্দিষ্ট করারোপ পদ্ধতি চালু করার পাশাপাশি কর ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন করা প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন একাত্তর টেলিভিশনের প্লানিং এডিটর ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক সুশান্ত সিনহা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক।

তারা বলেন, ২০০৪-০৫ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২১-২২ অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্য থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়ে ৩০ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আয় প্রায় সাড়ে ১২ গুণ বেড়েছে। অথচ তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন, সংশোধনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার সময় তামাক কোম্পানিগুলো রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে।

তারা আরও বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো চোরাচালান বাড়ার আশঙ্কাসহ বিভিন্ন ধরনের যুক্তি তুলে ধরে। তবে এসব যুক্তি তামাক কর বৃদ্ধির পথে বাধা হওয়ার মতো বাস্তবসম্মত নয় বলে তারা উল্লেখ করেন। সরকারের রাজস্ব আদায় আরও বাড়াতে তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপের কোনো বিকল্প নেই।

প্রশিক্ষণের তৃতীয় ও শেষ দিনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির প্রকল্প পরিচালক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক এবং অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক হামিদুল হিল্লোল।

তারা বলেন, তামাক গ্রহণের কারণে দেশে বর্তমানে ৪০ বছর বয়সের কাছাকাছি তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেড়েছে। তামাকের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের কারণে চুল, ব্রেইন, মস্তিষ্ক, চোখ, নাক, দাঁত, রক্ত, হাড় ও ত্বকসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, তামাকজাত দ্রব্যের দাম ও কর বাড়ালে একদিকে এর ব্যবহার কমানোর সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ে। বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে কর ও মূল্যভিত্তিক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে জনস্বাস্থ্য এবং রাজস্ব উভয় দিক বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত তামাক কর নীতি প্রয়োজন।

তিন দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী, উন্নয়নকর্মী, তামাক নিয়ন্ত্রণকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমাতে তামাকের ওপর কর বৃদ্ধির বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর