সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে দেশের কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেছেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
বৃহস্পতিবার (সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং গত কয়েক দিনের তুলনায় এখন সরবরাহ বেড়েছে। বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত বোঝা যাবে আরও অন্তত তিন মাস পর।
তিনি আরও বলেন, পোশাকশিল্পে কোনো সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তও একদিনে নেওয়া সম্ভব নয়। পাইপলাইনে থাকা অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়দায়িত্বসহ নানা বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এ কারণে একটি কারখানা বন্ধ করতে প্রায় ছয় মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ছয় মাস বা এক বছর আগের কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার কারণে এখন কোনো কারখানা বন্ধ হলে সেটিকে বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ওয়াশিংসহ পোশাকশিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, সম্প্রতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে পোশাক কারখানাগুলো সাধারণত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তারপরও সময়মতো পণ্য পাঠাতে উদ্যোক্তারা চেষ্টা করেছেন।
গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজিএমইএ সভাপতি। এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সমস্যার বড় ধরনের সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য স্থলভিত্তিক মজুত টার্মিনাল নির্মাণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার চুক্তি ইতোমধ্যে হয়েছে। এর বাইরে একাধিক এফএসআরইউ আনার পরিবর্তে স্থলভিত্তিক মজুত ব্যবস্থার দিকে যেতে চায় বিজিএমইএ।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় গ্যাস সংযোগ ও রেশনিংয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, ১০০ থেকে ৫০০ পিএসআই বয়লারসম্পন্ন কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে কম সুদের সবুজ ঋণ এবং উপকূলীয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত জোরদারের দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে নিজেদের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মাহমুদ হাসান খান বলেন, তিনি ২০১৯ সাল থেকে তার প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে উৎপাদিত প্রায় ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে বিজিএমইএ ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করতে যাচ্ছে। জাপানি ভাষায় যোগাযোগে সক্ষম কর্মকর্তাদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের জাপানমুখী রফতানি আগামী দিনে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শুধু কম দামের পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবননির্ভর ও আধুনিক শিল্প হিসেবে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সঙ্গে কৌশলগত চুক্তি করার কথাও জানান তিনি।
এএইচ/এফএ




