রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ প্রতিদান দিতে পারে এমন বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে করসেবা সহজ, রাজস্ব প্রশাসন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এবং কর আইন আরও পূর্বানুমানযোগ্য করার কথা জানিয়েছেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ এসব কথা বলেন তিনি।
আহসান হাবিব বলেন, ‘এনবিআরের দৃষ্টিতে সব করদাতা সমান। করসেবা গ্রহণ সহজ করা হবে। আইনে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে আগাম পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সামগ্রিক অটোমেশনের মাধ্যমে আইনের প্রতিপালন নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।’
৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দেশের প্রয়োজনেই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর।’
আহসান হাবিব বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাস বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এ সময়ে এনবিআর এ যাবৎকালের শেষ প্রান্তিকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করেছে।’
আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমেছে
গত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব প্রায় আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে উল্লেখ করে এনবিআর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, একই সময়ে রাজস্ব আহরণের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
‘১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট রাজস্বের ৫৫ শতাংশ আসে আমদানি শুল্ক থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২৭ শতাংশে নেমেছে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ উৎপাদনমুখী শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’
বর্তমানে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট মিলিয়ে মোট রাজস্বের ৭৩ শতাংশ আসছে। ফলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানান আহসান হাবিব। এর আগের অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
তার মতে, প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কাটিয়ে রাজস্ব আদায়ে এটি একটি ‘সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত’।
উৎসে কর আদায়ে নজর
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসে আয়কর কর্তনকে এনবিআরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনবিআর।
নতুন খাতসহ উৎসে কর কর্তনে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, সঠিক নীতির সময়মতো বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘পণ্য রপ্তানি, খুচরা বিক্রি, জুয়েলারি ব্যবসা, সম্পত্তি হস্তান্তর ও লভ্যাংশ আয়ের মতো খাত থেকে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এছাড়া অগ্রিম ও বকেয়া কর আদায়ে কর অঞ্চলগুলোতে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত তদারকি করা হবে বলেও জানান তিনি।
কর ফাঁকি ঠেকাতে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’
কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে বলে জানান এনবিআর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। অনিবাসী করদাতাদের কর ফাঁকিও তদারকি করা হবে বলেও জানান তিনি।
পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর দ্রুত সম্পন্ন, আদালতে বিচারাধীন উচ্চ রাজস্বের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অডিট নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থায় কঠোর নজর
ভ্যাট খাতে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো, নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন ভ্যাটদাতা শনাক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান আহসান হাবিব।
তিনি বলেন, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন, পণ্য দ্রুত খালাস, বকেয়া আদায় ও মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি বন্ডের অপব্যবহার রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার এবং নিলাম কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
নগদনির্ভর অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জ
দেশের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক উল্লেখ করে আহসান হাবিব বলেন, ‘ব্যবসায়িক লেনদেনেরও বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক। সাপ্লাই চেইনে ডিজিটাইজেশনের ঘাটতি রয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগও পর্যাপ্ত নয়। একই সঙ্গে এনবিআরের অটোমেশনও এখনো পূর্ণতা পায়নি বলে।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বিভাগ) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পুঁজি ও প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। এটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করে।’
ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে করদাতাদের অধিকাংশ সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজস্ব প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।’
সৈয়দ মুসফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার পাশাপাশি কর আদায়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে এনবিআর মাত্র ২১ পয়সা খরচ করে। তাই রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে ব্যয় না দেখে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।’
এমআর/এএম




