টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সামনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকী।
তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন শুধু আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ কিংবা প্রতিবেদন তৈরির বিষয় নয়। মানুষের জীবনে সত্যিকারের উন্নতি ঘটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।
বুধবার (১২ আগস্ট) ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড এসডিজি’র সমাপনী দিনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জোনায়েদ সাকী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছেছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কৌশলপত্র তৈরি করছে। এই কৌশলপত্রে জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়নকে কেবল আন্তর্জাতিক প্রয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবনের উন্নয়ন ঘটানোই সরকারের অঙ্গীকার। এসডিজির লক্ষ্যগুলো সরকারের বৃহত্তর উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু এসডিজি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা নয়। প্রতিবেদন হতে হবে যথার্থ এবং দেশের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। অতীতে বাস্তবতা ও বিভিন্ন উপাত্ত-তথ্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক দেখা গেছে। বর্তমান সরকার কোনো ধরনের তথ্য বা উপাত্তের কারসাজি গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি জেনে সেখান থেকে অগ্রগতি পরিমাপ করতে চায় সরকার।
এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়ন প্রকল্পের ধরনেও পরিবর্তন আনার কথা জানান সাকী। তিনি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ প্রকল্পের ধারণায় যাওয়া হচ্ছে। একটি কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় পরিপূরক প্রকল্পগুলো সমন্বিতভাবে নেওয়া হবে। একইসঙ্গে প্রথমে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সফল হলে তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সাকী বলেন, বর্তমানে ৯০টির বেশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। এগুলো কমিয়ে ১০টির নিচে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এর মাধ্যমে যেন প্রয়োজন অনুযায়ী সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেটিই হবে মূল লক্ষ্য। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচিকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষাকে শুধু মানুষের সাময়িক স্বস্তির কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না সরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ গেলে তারা তা ব্যয় করেন এবং অর্থনীতিতে পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মানুষ যুক্ত হন। অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা মানুষকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে সাকী বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগের তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় না। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
এর পাশাপাশি বিনিয়োগ-নির্ভর উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পাঁচটি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। এগুলো হলো- জ্বালানি, আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ কমানো, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তির বিকাশ এবং পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষা।
সাকী বলেন, জ্বালানি খাতকে আমদানি-নির্ভরতা ও দুর্নীতির প্রভাব থেকে বের করে আত্মনির্ভর নীতির দিকে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সংস্কারের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কাজও চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থনীতিতে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির প্রসারে গ্রাম পর্যায় থেকে তরুণদের যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে নদী, খাল-বিলসহ প্রাকৃতিক সম্পদকে দখল ও ধ্বংস থেকে মুক্ত করে উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েকটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল উল্লেখ করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন ও লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এ জন্য করনীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি মানুষের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায় সরকার। পাঁচ বছরের উন্নয়ন কৌশলপত্র, উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কাজকে তিনি জাতীয় পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এএইচ/এএইচ



