অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ছয় মাসের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে যা বছরে দুইবার হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে সুদহারভিত্তিক নীতির পরিবর্তে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা তুলে ধরে এ খাতের সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও হাসনাত আবদুল্লাহ অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব দেন। জবাবে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘এটি ভালো পরামর্শ। আমার মনে হয়, এটা নেওয়া উচিত।’
বৈঠকে সুদহারভিত্তিক মুদ্রানীতির পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যকর ও সময়োপযোগী মুদ্রানীতির কাঠামো প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান কাঠামো থেকে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে রূপান্তর জরুরি। বিশ্বের অনেক উদীয়মান অর্থনীতি এ ধরনের নীতি গ্রহণ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে এবং বাংলাদেশও একই পথে অগ্রসর হতে পারে।
বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়েও আলোচনা হয়। জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বক্তব্য না দিলেও গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম ইসলামী ধারায় পরিচালিত হলেও তার ধারণা প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং সেবা নিতে আগ্রহী। নিয়ন্ত্রক হিসেবে সেই সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণে কাজ করছে।
গভর্নর আরও বলেন, গত এক দশকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন সমস্যার অন্যতম কারণ ছিল শরিয়াহ বোর্ডের দুর্বলতা। এ কারণে শরিয়াহ বোর্ডকে আরও কার্যকর ও ক্ষমতাবান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপনায় আরও জানানো হয়, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য এখনো পূর্ণাঙ্গ আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার গড়ে ওঠেনি। এ ধরনের বাজার চালুর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইসলামিক ব্যাংক লিকুইডিটি সাপোর্ট, মুদারাবা লিকুইডিটি সাপোর্ট ও স্পেশাল লিকুইডিটি সাপোর্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। অতিরিক্ত তারল্য প্রত্যাহারে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া উপস্থাপনায় দেশের অর্থনীতির কয়েকটি চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে মন্দাভাব এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। তবে প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবাহ দেশের বহিঃখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।
টিএই/এআরএম




