মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

City Bank CityTouch

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এনবিআরের রোডম্যাপ, খোঁজ নিয়েছে আইএমএফ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এনবিআরের রোডম্যাপ, খোঁজ নিয়েছে আইএমএফ

দেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা ও সংস্কার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল। বৈঠকে এনবিআর জানিয়েছে, করজাল সম্প্রসারণ, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায় জোরদারের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, সংস্থাটির সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল এতে উপস্থিত ছিল।

বৈঠকে নতুন অর্থবছরের বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কৌশল সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখিয়েছে আইএমএফ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে এই হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বৈঠকে জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে করহার বৃদ্ধি না করে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তাদের মতে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায়ও স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, রাজস্ব প্রশাসনকে আধুনিক ও কার্যকর করতে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে আদালতে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবেই আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছে। সেই প্রেক্ষাপটে চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের কৌশল নিয়েও বিস্তারিত জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় আইএমএফ এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে। নতুন অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স রাজস্ব আদায় বাড়াতে কাজ করছে বলেও আইএমএফকে অবহিত করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। পরবর্তী দুই অর্থবছরেও আইএমএফের নির্ধারিত কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও তা প্রায় ৮ শতাংশে নেমে আসে এবং রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।

এদিকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল এনবিআরের উপস্থাপিত পরিকল্পনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করলেও পরবর্তী বৈঠকে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী বৈঠকগুলোতে সম্ভাব্য নতুন ঋণচুক্তি, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থায়ন এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে নির্বাচনের পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, করহার বৃদ্ধি নয়, বরং করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। এতে বাজেট ঘাটতি কমার পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহেও সরকারের সক্ষমতা বাড়বে।


এমআর/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর