সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ভূরাজনৈতিক বিভাজন বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে: ড. ফাহমিদা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ভূরাজনৈতিক বিভাজন বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে: ড. ফাহমিদা
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

ভূ রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দাতা দেশগুলোর পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের কারণে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের বর্তমান সংকট সাময়িক নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের অর্থায়ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

বুধবার (৮ জুলাই) সিপিডি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ওইসিডি মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬ রিপোর্ট: পার্সপেকটিভস ফ্রম সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। কয়েক দশক ধরে আর্থিক সম্পদের সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, বর্তমানে তা একই সঙ্গে রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপে পড়েছে। এর ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।কোভিড-১৯ মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, সংঘাত এবং ঋণ সংকটের মতো বৈশ্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাভোগী। কিন্তু বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে উন্নয়ন সহায়তার সম্প্রসারণের যুগ শেষ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির (ডিএসি) সদস্য দেশগুলোর বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে অবদান ১৫ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সহায়তা ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।

ড. ফাহমিদা বলেন, উন্নত দেশগুলো উচ্চ সরকারি ঋণ, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আর্থিক সংকোচনের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাড়ায় অনেক দেশ এখন বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পরিবর্তে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার ওপর।

তিনি আরও বলেন, দাতা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বৈদেশিক সহায়তার বাজেট কমিয়ে আনছে। ফলে উন্নয়ন সহায়তার অর্থ ব্যবহারে ‘অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য’ নিশ্চিত করার প্রবণতা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন সহায়তা কমিটির ১১টি বড় দাতা দেশ ইতোমধ্যে ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা বহুপাক্ষিক অর্থায়ন ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী দাতা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। সেই সঙ্গে ভূ রাজনৈতিক বিভাজন বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

ড. ফাহমিদা আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো এবং অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করাও জরুরি হয়ে উঠবে। শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের কার্যক্রম, অগ্রাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

আলোচনায় ওইসিডির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অঁরি-বার্নার সোলিনিয়াক-লেকোমতে, প্রতিবেদনের সহ-প্রণেতা লিওনার্দো আলতিয়েরি ও মারিউস গেরিন এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

এএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর