বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রাজস্ব আদায়ে কাল থেকে এ-চালান ব্যবস্থায় যাচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

সরকারি রাজস্ব আদায়ে কাল থেকে এ-চালান ব্যবস্থায় যাচ্ছে সরকার

সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য সব ধরনের সরকারি প্রাপ্তি আদায়ে আগামীকাল (১ জুলাই) থেকে পুরোপুরি এ-চালান ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা অধীনস্থ দফতর আর ম্যানুয়াল চালান বা অন্য কোনো পৃথক ব্যবস্থায় সরকারি অর্থ গ্রহণ ও জমা দিতে পারবে না। 

সরকারি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে জমা নিশ্চিত করা, নগদ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা, আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ভুয়া চালানের ঝুঁকি দূর করতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) অর্থ বিভাগের এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য সব ধরনের প্রাপ্তি কেবল এ-চালানের মাধ্যমেই গ্রহণ ও জমা হবে। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থ সংগ্রহের জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালু থাকলে তা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে সংরক্ষিত সরকারি অর্থ ৩০ জুনের মধ্যে এ-চালানের মাধ্যমে সরকারের ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে কার্যকর হচ্ছে, যখন এ-চালান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, লেনদেন এবং রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। সর্বশেষ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এ-চালান এখন একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অর্থবছরভিত্তিক এ-চালান প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ২২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

একই সময়ে এ-চালানের মাধ্যমে ৬ কোটি ৭৫ লাখ চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি চালানের মাধ্যমে এ-চালান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সাত অর্থবছরে এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১৯ কোটি ৩ লাখের বেশি চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে এবং সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এ-চালান এখন শুধু একটি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ পরিশোধের মাধ্যম নয়, বরং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আদায়ের পরিমাণ ও লেনদেনের সংখ্যায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনলাইনে চালানের সংখ্যা ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে অনলাইনে আদায়ের পরিমাণ ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকায়। অন্যদিকে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসি লেনদেনের মাধ্যমেও সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

অর্থ বিভাগের মতে, এ-চালান পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের প্রকৃত নগদ অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ছড়িয়ে থাকা অলস সরকারি অর্থের পরিমাণ কমবে এবং সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর হবে।

অতীতে সরকারি ফি বা রাজস্ব জমা দিতে অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় যেতে হতো। এতে নাগরিকদের সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হতো। পাশাপাশি সরকারি কোষাগারে অর্থ স্থানান্তরে বিলম্ব, হিসাব সমন্বয়ের জটিলতা এবং ভুয়া চালান তৈরির ঝুঁকিও থাকত। এ-চালান ব্যবস্থা এসব সীমাবদ্ধতা দূর করেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা কাউন্টার, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়, ট্যাপসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ও সেবা ফি পরিশোধ করা যাচ্ছে।

নাগরিকদের জন্য এ ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধা হলো দেশের যেকোনো স্থান থেকে সহজে সরকারি অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ। অর্থ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চালানের রসিদ তৈরি হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। ফলে সরকারি সেবা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত হয়েছে।

সরকারের জন্যও এ-চালান বহুমাত্রিক সুবিধা নিশ্চিত করছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা হওয়া অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়। ফলে সরকারি প্রাপ্তির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের ঋণ ও নগদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়।

এ-চালানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো স্বয়ংক্রিয় হিসাব সমন্বয়। কোনো অর্থ জমা হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ক্রেডিট স্ক্রল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থায় আপলোড হওয়ায় হিসাব মিলানোর সময় কমে আসে এবং ত্রুটির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

এ-চালান ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর এবং হিসাবরক্ষণ অফিসগুলো তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব আদায়, লেনদেনের অবস্থা ও জমার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ফলে অস্বাভাবিকতা, বিলম্ব কিংবা সম্ভাব্য গরমিল দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

এ ছাড়া চালান যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে যে কোনো চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়। এতে ভুয়া চালান, জাল দলিল এবং রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি কমছে।

বৃহত্তর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগ ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ-চালান চালু করে। সরকারি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ভুয়া চালান প্রতিরোধ এবং সরকারের নগদ অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য নিশ্চিত করাই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। 

আগামীকাল থেকে বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই ডিজিটাল সংস্কার নতুন এক ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

এএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর