- মোট ঋণের ৩২% বড় গ্রাহকদের কাছে
- বড়দের ঋণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা
- ছোটদের ঋণ কমেছে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা
- ০.১৬% গ্রাহকের হাতে ৫৬.৮২% ঋণ
- খেলাপি ঋণ ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা
দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ ক্রমেই অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ঋণের এই কেন্দ্রীভবন ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কারণ বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ খেলাপি হলে তার প্রভাব পড়ে ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও মুনাফায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন মাত্র ৪ হাজার ৮৯৯ গ্রাহকের কাছে রয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকার ঋণ। এটি ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট ঋণ হিসাব বা গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি ৫৯ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ৮৯৯টি বড় ঋণ হিসাবের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় গ্রাহকদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণধারী গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭০৪ জন। তখন তাদের হাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৭.৬ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে বড় গ্রাহকদের হাতে ঋণের অংশ বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের এ ধরনের কেন্দ্রীভবন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ অল্পসংখ্যক গ্রাহকের মধ্যে একজন বা কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে গেলে তার প্রভাব সরাসরি ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও মুনাফার ওপর পড়ে। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কঠোর এক্সপোজার সীমা নির্ধারণ এবং ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য ঋণের সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তাগিদ সত্ত্বেও একাধিক শিল্পগোষ্ঠী নির্ধারিত সীমার বাইরে ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি বড় ঋণের সীমা আরও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক এখন তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সরাসরি বা ফান্ডেড ঋণ একজন গ্রাহককে দিতে পারবে। আগে এই সীমা ছিল ১৫ শতাংশ। যদিও সরাসরি ও নন-ফান্ডেড ঋণ মিলিয়ে মোট এক্সপোজার ২৫ শতাংশের মধ্যেই রাখতে হবে। ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর থাকবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যাংকের মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকা হলে আগে একটি গ্রুপকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরাসরি ঋণ দেওয়া যেত। নতুন নিয়মে সেই সীমা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়।
অন্যদিকে বড় গ্রাহকদের কাছে ঋণ বাড়লেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণগ্রহীতার ৬৭.৪৫ শতাংশ বা এক কোটির বেশি গ্রাহকের ঋণের পরিমাণ এক লাখ টাকার নিচে। অথচ তারা সবাই মিলে পেয়েছেন মাত্র ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা ঋণ।
এ ছাড়া ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ রয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৯৪৫ জন, যা মোট ঋণ হিসাবের ৯৩.৭৩ শতাংশ। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক দেশের মোট ঋণের মাত্র ৯.১৯ শতাংশ পেয়েছেন।
পরিসংখ্যান আরও বলছে, গত এক বছরে শীর্ষ ৪ হাজার ৮৯৯ বড় গ্রাহক নতুন করে ১৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ পেয়েছেন। বিপরীতে বাকি এক কোটি ৫৯ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকের সম্মিলিত ঋণ ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা কমে গেছে।
ঋণের কেন্দ্রীভবনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় ১০ লাখ টাকার বেশি ঋণধারীদের হিসাব বিশ্লেষণ করলে। মাত্র ২৬ হাজার ৫৯৭ জন গ্রাহক, যা মোট ঋণগ্রহীতার মাত্র ০.১৬ শতাংশ, তাদের হাতে রয়েছে ১০ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা ঋণ। অর্থাৎ দেশের মোট ব্যাংক ঋণের ৫৬.৮২ শতাংশই রয়েছে এই ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর কাছে।
আরও পড়ুন: মুদি দোকান করের আওতায় আনা কি সম্ভব?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের শীর্ষ করপোরেট ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোই মূলত এই ঋণের বড় অংশ ব্যবহার করছে। ফলে কোনো একটি বড় গ্রুপ আর্থিক সংকটে পড়লে একাধিক ব্যাংক একসঙ্গে বিপদের মুখে পড়তে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এ ঝুঁকি আরও বেশি। সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ১ হাজার ১১২ জন গ্রাহকের হাতে রয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত।
ঋণ বিতরণের এই ভারসাম্যহীনতার প্রভাব ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপরও পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে রেকর্ড ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ।
আরও পড়ুন: ঋণ শোধের চাপ বাড়ছে, কমছে প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫ অনুযায়ী, বিপুল খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে ঋণাত্মক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ হার ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকা প্রয়োজন।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের সিংহভাগ যখন অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে চলে যায়, তখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য আনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানো এখন ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঋণের এই সংস্কৃতিটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এ ছাড়া কিছু অসৎ কর্মকর্তা অসদাচরণকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, যার কারণে ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিকে পক্ষপাতমূলকভাবে বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানিকে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যারা অসদাচরণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তা দেখে অন্যরাও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়েছেন।
টিএই/এআর




