সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘দুর্নীতি ঠেকাতে নগদহীন অর্থনীতির বিকল্প নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

‘দুর্নীতি ঠেকাতে নগদহীন অর্থনীতির বিকল্প নেই’

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত নগদহীন অর্থনীতিতে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে পারলে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমবে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর পাশাপাশি এর অপব্যবহার ও কৃত্রিম জটিলতা বন্ধে কার্যকর নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমভিত্তিক সংগঠন ইকোনমিকস ক্লাব এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ক হ্রাসসহ ব্যবসা ও রফতানি সহজ করার কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় দ্রুত বাড়ায় ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পগুলোর মূল ঋণ পরিশোধের সময় বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত অধিকাংশ অবকাঠামো প্রকল্প থেকে আয় হয় টাকায়, অথচ ঋণ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে এ ঋণের চাপ আরও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শুধু ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজার, বন্ড বাজার এবং অবকাঠামো সম্পদকে বিনিয়োগযোগ্য আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। মেট্রোরেল ও সেতুর মতো বড় প্রকল্পগুলোকে এ প্রক্রিয়ার আওতায় এনে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশ সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণের সুযোগ হারাচ্ছে। ফলে কঠিন শর্তের ঋণ বাড়ছে এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। এজন্য জিডিপির অন্তত ১৫ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব আদায় এবং শিল্প উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিগত দেড় দশকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে। তবে প্রবাসী আয়ের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসীদের অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগের সুযোগ এবং তিন বছর মেয়াদে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, আগামী এক দশকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত করদাতার সংখ্যা বাড়ানো। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা বেশি জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করলেও তারা আনুষ্ঠানিক করদাতার আওতায় নেই।

দুর্নীতি দমনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার অস্বাভাবিক সম্পদের খবর প্রমাণ করে দুর্নীতি এখন অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত নগদহীন অর্থনীতিতে রূপান্তরের বিকল্প নেই। সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হলে দুর্নীতির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

তবে তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগের পরও অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল করে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অনলাইনে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফরম পূরণের সুযোগ থাকলেও অনেক সময় জমা দেওয়ার অপশন অকার্যকর রাখা হয়। এতে করদাতাদের বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, যা ডিজিটাল ব্যবস্থার আড়ালে দুর্নীতিরই আরেকটি রূপ।

তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘাটতি কমাতে কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো নির্মাণে ঋণ গ্রহণ যৌক্তিক হলেও দুর্নীতির জন্য কোনো ধরনের ঋণ গ্রহণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


এএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর