বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড়—দুই-ই কমে এসেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিদেশি ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ও অনুদানের নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ডলারেরও বেশি।
আরও পড়ুন: আরও বাড়ল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
সবচেয়ে বেশি কমেছে অনুদানের প্রতিশ্রুতি। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে অনুদানের প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
নতুন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থছাড়েও বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছে ৫৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। ডলারের বিপরীতে বর্তমান বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা ধরে হিসাব করলে, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০৩ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা কম অর্থছাড় হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদেশি সহায়তা থেকে ৮৬ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) তা কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে কমিয়ে আনা লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হচ্ছে না।
গত ১১ মাসের গড় অর্থছাড়ের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে মোট বিদেশি ঋণের ছাড় দাঁড়াবে প্রায় ৫৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে এডিপির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা কম অর্থছাড় পাওয়া যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে বিদেশি ঋণ থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি প্রায় ৯৬ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, দেশটি দিয়েছে ৯৩ কোটি ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৭৮ কোটি ডলার। এছাড়া চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার এবং ভারত ২৫ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
আরও পড়ুন: বছরের পর বছর চলমান আট মেগা প্রকল্প!
অন্যদিকে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪১৩ কোটি ২২ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নেওয়া ঋণের রেয়াতকাল শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। একই সময়ে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৪০ কোটি ডলার।
টিএই/এমআই




