** নতুন প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ সীমিত হচ্ছে
** প্রশাসনিক ব্যয় ও সুদের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে
** মেগা প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ
** ডিপিতে সমাপ্তির লক্ষ্য থাকলেও অগ্রগতি পিছিয়ে
** উন্নয়ন কার্যক্রমে দক্ষ ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি
দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের মতো মেগা উদ্যোগ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।
তবে বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বরং অন্তত আটটি বড় প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলোর কাজ আগামী অর্থবছরেও শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বিশ্লেষণ করে দেখা, শীর্ষ ২০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে আটটিকে আগামী অর্থবছরে সমাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পগুলোর বর্তমান অগ্রগতি, অর্থ ব্যয়ের হার এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এগুলোর কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এমনকি শতভাগ সম্পদ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলেও প্রকল্পগুলো নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে না।
দেখা গেছে, উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাওয়া আটটি প্রকল্প হলো ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নির্মাণ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন কর্মসূচি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন প্রকল্প, ব্রেব নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প, অ্যাসেট প্রকল্প এবং এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি এমআরটি লাইন-১। রাজধানীর যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। দুই বছর পর ২০২৭ সালের জুন নাগাদ অগ্রগতি ২১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদের তুলনায় কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। ফলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন প্রকল্পেও। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে বিবেচিত এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটির অগ্রগতি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ছিল মাত্র ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী দুই বছরে তা ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হলেও প্রকল্প সমাপ্তির জন্য এই অগ্রগতি মোটেও যথেষ্ট নয়।
বিদ্যুৎ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। ডিপিডিসির বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং পিজিসিবির গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্প দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
একইভাবে ব্রেব নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি এখনও অর্জিত হয়নি।
শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় উদ্যোগ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পও সময়মতো শেষ হওয়ার সম্ভাবনা হারাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
অন্যদিকে এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর চার লেন মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার কথা থাকলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সেই সুফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
একইভাবে অ্যাসেট প্রকল্পও নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রকল্পটির বর্তমান অগ্রগতি এতটাই কম যে আগামী দুই বছরেও শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছে সিপিডি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পর্যবেক্ষণ বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় ‘ক্যারিওভার প্রকল্প’ এখন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে এডিপিতে থেকে যাচ্ছে এবং প্রতি বছর নতুন করে অর্থ বরাদ্দ নিতে হচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ পুরোনো প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে, যা নতুন উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ সীমিত করছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যা সমাধান হবে না। প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্র প্রক্রিয়া, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থ ছাড়, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না করলে একই ধরনের সমস্যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণের সময় বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে অতিরিক্ত আশাবাদী সময়সীমা নির্ধারণ করাও বিলম্বের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম করবে এবং সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে। ফলে উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও জবাবদিহিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, একই সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়ও। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি, সুদ ও অন্যান্য আর্থিক দায় যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে একই প্রকল্প শেষ করতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। এতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
তারা বলছে, উন্নয়ন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা বাড়ানো, সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় দেশের উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে ব্যয় হলেও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে না পারা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতার ঘাটতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা উন্নয়ন সহযোগীদের ক্রয়বিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় পরামর্শকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর সুযোগে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ে, যার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমানে চলমান ৯৯৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের গড় বয়স প্রায় ৫ দশমিক ৭ বছর। এর মধ্যে ৩২২টি প্রকল্পের বয়স পাঁচ থেকে ১০ বছর এবং ৪৭টি প্রকল্প ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলমান। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে নির্মাণ ব্যয় নিয়মিতভাবে বাড়ছে। অনেক প্রকল্পে একাধিকবার সময় ও ব্যয় সংশোধন করা হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা থাকা ২০টি বড় প্রকল্পের অগ্রগতি উদ্বেগজনক।
আট মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি
(• সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট — শুরু জুলাই ২০১৫ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ১.০%
• যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন (প্রথম সংশোধিত) — শুরু জুলাই ২০১৮ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৯.৭%
• ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (লাইন-৫): নর্দান রুট — শুরু জুলাই ২০১৯ — অগ্রগতি ১২.২ %)
• সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) — শুরু জানুয়ারি ২০১৭ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ২৮.০%
• ডিপিডিসির বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ (প্রথম সংশোধিত) — শুরু জানুয়ারি ২০১৭ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫১.২%
• পিজিসিবির আওতায় বিদ্যুৎ গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ (সংশোধিত) — শুরু জুলাই ২০১৬ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৩.১%
• এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ (দ্বিতীয় সংশোধিত) — শুরু সেপ্টেম্বর ২০১৬ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৭৮. ১%
• ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্প (লাইন-৬) (তৃতীয় সংশোধিত) — শুরু জুলাই ২০১২ — বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৭৮.৩%
এএইচ/এআরএম




