শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

‘চতুর্থ প্রান্তিকে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রত্যাশা অবাস্তব’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

M
সংবাদ সম্মেলনে বাজেট নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরছেন সিপিডি ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আকস্মিক ও নাটকীয় উন্নতির প্রত্যাশা অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। 

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ, রফতানি, আমদানি ও মূল্যস্ফীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ক্ষেত্রে যে ভিত্তি ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরুতেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন সরকার জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বড় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা দাঁড়িয়ে আছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ দেখা যায়।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আমদানি প্রতিস্থাপক ও রফতানিমুখী শিল্পকে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে, আবার কোথাও রফতানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ দিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। একইভাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে আয়ের পুনর্বণ্টন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌর প্যানেলসহ কয়েকটি খাতে কর-সুবিধার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, পুনর্বণ্টন, প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে যে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ প্রশাসন এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।


বিজ্ঞাপন


মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর প্রাক্কলনের ভিত্তি। সরকারের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রাগুলোর প্রায় সবই এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। সম্পদ আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, রফতানি ও আমদানি—সব ক্ষেত্রেই যে বেইসলাইন ধরা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক ১ দশমিক ৮ শতাংশের মতো। অথচ পুরো বছরের জন্য প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাব ধরা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি এখনো সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি অবস্থানে থাকলেও বাজেট প্রাক্কলনে অনেক বেশি আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য।

মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বাজেটে মূলত ধরে নেওয়া হয়েছে যে চলতি অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমে আসবে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়বে এবং রাজস্ব আহরণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন প্রত্যাশা খুব বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।

তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে আরও বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপর বাজেট প্রণয়ন করতে পারত। কারণ বর্তমান সরকারের হাতে চলতি অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসই ছিল। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল না। ফলে আগের সরকারের সময় থেকে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই বাজেটের ভিত্তি নির্ধারণ করা হলে তা আরও গ্রহণযোগ্য হতো। সেপ্টেম্বরের মধ্যে চলতি অর্থবছরের চূড়ান্ত অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশিত হবে। তখন রপ্তানি, আমদানি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। সেই তথ্যের সঙ্গে বর্তমান বাজেট প্রাক্কলনের তুলনা করলে বাস্তবতা ও প্রত্যাশার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা ও নীতিগত প্রণোদনা দিয়েছে। আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প, রফতানিমুখী শিল্প ও উদ্যোক্তাদের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু নীতিগত সুবিধা দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে না। সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু করা কিংবা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। এগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। কিন্তু এর সুফল পেতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির ফেলো বলেন, বাজেটে বণ্টনমূলক অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ কম। তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। 

জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার সরকার করেছে, তা বাস্তবায়নে নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

এএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর