মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

এনবিআরের ব্যবসাবান্ধব কৌশল, স্বস্তি মিলবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

এনবিআরের ব্যবসাবন্ধব কৌশল, স্বস্তি মিলবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের

* ত্রৈমাসিক রিটার্নে কমবে সময় ও খরচ
* ভ্যাট নিবন্ধনের লক্ষ্য ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান
* তিন মাস পরপর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ 
* ডিজিটাল অডিটে কমবে হয়রানি 
* প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে বাড়বে রাজস্ব আদায় 

দেশের কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মাসিক রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


একইসঙ্গে ভ্যাট প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে দাখিল করতে হয়। ফলে একজন করদাতাকে বছরে ১২ বার রিটার্ন জমা দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেই সংখ্যা কমে বছরে মাত্র চারবারে নেমে আসবে। অর্থাৎ প্রতি তিন মাসের তথ্য একত্রে উপস্থাপন করে একটি রিটার্ন দাখিল করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসা সহজীকরণ, কর পরিপালনের ব্যয় কমানো এবং আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তি: 
দেশের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই আলাদা হিসাব বিভাগ নেই। ফলে প্রতি মাসে হিসাব সংরক্ষণ, ভ্যাট চালান যাচাই, রিটার্ন প্রস্তুত এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দেওয়া তাদের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।


বিজ্ঞাপন


অনেক উদ্যোক্তাকে কেবল রিটার্ন প্রস্তুতের জন্য হিসাবরক্ষক বা পরামর্শকের সহায়তা নিতে হয়। এতে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে জরিমানা, সুদ ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। 

 

 

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, মাসিক রিটার্নের বাধ্যবাধকতা অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে থাকতে উৎসাহিত করে। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে করদাতারা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ভ্যাট পরিপালন করতে পারবেন।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই যেখানে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ব্যবস্থাকে বোঝা নয়, বরং সহজ একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখবেন। রিটার্ন দাখিল সহজ হলে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের হারও বাড়বে।

ভ্যাট জাল সম্প্রসারণে নতুন কৌশল:
রাজস্ব প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুলসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থাকলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় এই সংখ্যা এখনও অনেক কম বলে মনে করা হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত বিশেষ ভ্যাট নিবন্ধন অভিযানে এক লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়। এর ফলে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৯২ হাজার ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে। এরপর রয়েছে সেবা, আমদানি-রফতানি ও উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান।

রাজস্ব বোর্ড আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কর্মকর্তাদের মতে, করদাতাবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল হচ্ছে পুরো ভ্যাট প্রশাসন:
ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থার পাশাপাশি ভ্যাট প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল, তথ্য যাচাই, কর নিরূপণ এবং অডিট কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এতে ব্যবসায়ীদের আর কাগজপত্র নিয়ে অফিসে দৌঁড়াতে হবে না।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অডিটের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র জমা দিতে হয়। অডিট প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয় এবং এতে ব্যবসা পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটে। নতুন ব্যবস্থায় এসব ঝামেলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যার ব্যবহার করে তাদের ক্রয়, বিক্রয়, মজুত এবং হিসাব সংরক্ষণ করবে, তারা ডিজিটাল অডিট সুবিধা পাবে। ভ্যাট কর্মকর্তারা সরাসরি ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় যাচাই কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে ম্যানুয়াল অডিট, কাগজপত্র যাচাই এবং দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই অতীত হয়ে যাবে। 

NBR_iv

কর আদায়ে বাড়বে দক্ষতা:
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা শুধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেবে না, সরকারের রাজস্ব আহরণেও বড় ভূমিকা রাখবে। ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু করা যাবে।

বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য প্রদানের সুযোগ রয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হলে সেসব ঝুঁকি কমে আসবে। একইসঙ্গে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়বে।

বর্তমানে যে নিয়ম রয়েছে:
বিদ্যমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের কার্যক্রমের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে মূসক-৯.১ ফরমে দাখিল করতে হয়।

রিটার্নে মোট বিক্রয়, করযোগ্য সরবরাহ, ক্রয়, আমদানি, প্রদেয় ভ্যাট, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট, কর সমন্বয় এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ভ্যাটের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করতে হয়। এ ছাড়া ভ্যাট চালান, স্টক রেজিস্টার, ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাবসহ বিভিন্ন নথি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা ও সুদ আরোপের বিধান রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বছরে ১২ বার থেকে কমে ৪ বার হবে, যা করদাতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

BNR_ii

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
এনবিআরের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, ব্যবসা সহজীকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, এনবিআরের এই সংস্কার ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ দাবি করে আসছিলাম। আমরা প্রতি মাসে রিটার্ন দাখিল করছি। এতে কিছুটা চাপের মধ্যে থাকতে হয় ব্যবসায়ীদের। তবে এনবিআরের এবার নতুন উদ্যোগ প্রতি চার মাস অন্তর রিটার্ন দাখিল করা যাবে। এমন উদ্যোগে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এটা যেন পুরোপুরি অনলাইনে সম্পাদন করা হয়। অফিস কেন্দ্রিক কিছু যেন না হয়, সেটাকে নিশ্চিত করতে হবে। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে। প্রতি মাসের লোড নিতে হবে না।  

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ত্রৈমাসিক রিটার্ন এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থার দাবি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিলেন। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় কমবে, হয়রানি হ্রাস পাবে এবং কর পরিপালনের সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।

তবে ডিসিসিআই সভাপতি সতর্ক করে বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে প্রতিটি আবেদন, অনুমোদন ও সেবার বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা প্রদানের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থার নতুন অধ্যায়:
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিল, ডিজিটাল অডিট এবং স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভ্যাট প্রশাসনে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমবে, করদাতার সংখ্যা বাড়বে, স্বেচ্ছা কর পরিপালন উন্নত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণও আরও শক্তিশালী হবে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত ভ্যাট সংস্কারকে ব্যবসাবান্ধব কর প্রশাসন গঠনের পথে অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সফল বাস্তবায়ন হলে ব্যবসায়ী, কর প্রশাসন এবং সরকার—সব পক্ষই লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এমআর/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর