- সিইটিপি সংকটে চামড়া খাতের অগ্রগতি থমকে গেছে
- এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় হারাচ্ছে বড় বাজার
- আন্তর্জাতিক মান না থাকায় ব্র্যান্ড বায়াররা আসছে না
- চামড়া রফতানি এখনো ১০০-১২৫ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ
- বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হিস্যা মাত্র ০.২৬ শতাংশ
- এক শতাংশ বাজার পেলেই আয় হতে পারে ৫০০ কোটি ডলার
- চামড়া খাতে বিনিয়োগে অনিহা ব্যাংকগুলোর
- লবণের দাম বাড়ায় বেড়েছে সংরক্ষণ ব্যয়
- সরকার ঘোষিত চামড়ার দাম কাগজে আছে বাস্তবে নেই
বিশ্বে চামড়ার বাজার যখন দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে তখন বিপরীত পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চামড়া বাজারের আকার দাঁড়াবে প্রায় ৬৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা চামড়ার উৎস হওয়া সত্ত্বেও এই বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনো নগণ্য। দেশের কাঁচা চামড়ার বৈশ্বিক হিস্যা ৩ থেকে ৪ শতাংশ হলেও প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি হিস্যা মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৈপরীত্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি (সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) সংকট। প্রায় দুই দশকের প্রকল্প, এক হাজার কোটির বেশি টাকা ব্যয় এবং হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পরও সিইটিপি এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। ফলে বিশ্বের বড় ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অধিকাংশ ট্যানারি। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কাঁচা ও আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া কম দামে কিনে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে চীন ও ভারত। অন্যদিকে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
চামড়া খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বর্তমান সংকট শুধু পরিবেশগত বা প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নে জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক
বিজ্ঞাপন
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রফতানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা সম্ভাবনার তুলনায় অতি সামান্য।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে মাত্র ১ শতাংশ অংশীদারিত্ব অর্জন করতে পারলেও বাংলাদেশ বছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রফতানি আয় করতে পারত। অথচ কয়েক বছর ধরে রফতানি আয় ১০০ থেকে ১২৫ কোটি ডলারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছিল ৯৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারে ওঠে। এরপর আবার পতন শুরু হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় হয় ১১৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১০৩ কোটি ৯২ লাখ ডলারে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে আয় হয় ১১৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে চীন একাই বছরে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের চামড়া রফতানি করছে। ভারতের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয় প্রায় ৫৭০ কোটি ডলার। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পিছিয়ে।
সিইটিপি: সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
চামড়া শিল্পের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি)। ২০০৩ সালে হাজারীবাগের দূষণ বন্ধ এবং পরিবেশসম্মত শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে ট্যানারি স্থানান্তরের প্রকল্প নেওয়া হয়। দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ হতে প্রায় দুই দশক সময় লাগে। প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১৭৫ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ১৫ কোটি টাকায়। কিন্তু বিপুল এই বিনিয়োগের পরও সিইটিপি এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, সিইটিপির নকশাগত ধারণক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে এর প্রকৃত সক্ষমতা পাওয়া গেছে মাত্র ১৪ থেকে ১৭ হাজার ঘনমিটার। অন্যদিকে সাভার শিল্পনগরীতে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৮ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য তৈরি হয়। কোরবানির মৌসুমে তা বেড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ঘনমিটারে পৌঁছে যায়। ফলে বিপুল অপরিশোধিত বা আংশিক শোধিত বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবেশগত পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকটি সূচকে সিইটিপি সন্তোষজনক হলেও বিওডি, টিএসএস এবং ক্লোরাইডের মাত্রা এখনো অনুমোদিত সীমার অনেক ওপরে। গত আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, বিওডির গ্রহণযোগ্য মান ৩০ হলেও পাওয়া গেছে ৩০৮। টিএসএসের মান ১০০ হওয়ার কথা থাকলেও ছিল ১৬২। ক্লোরাইডের মান ২ হাজারের বিপরীতে পাওয়া গেছে ৪ হাজার ১০০। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্য প্রমাণ করে যে সিইটিপি এখনো পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়।
এলডব্লিউজি সনদের অভাবে হারাচ্ছে বড় বাজার
বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো বর্তমানে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদপ্রাপ্ত ট্যানারি থেকেই চামড়া সংগ্রহ করে। এই সনদ ছাড়া ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য উন্নত বাজারে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে বর্তমানে সচল ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ১৬০টি। এর মধ্যে মাত্র আটটি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। সাভারের ভেতরে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা হাতে গোনা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে আসে না। ফলে বাংলাদেশি চামড়া কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন রপ্তানিকারকরা। শিল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে ওয়েট ব্লু ও ক্রাস্ট লেদার কিনে নেয়। পরে নিজেদের এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত কারখানায় তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে। অর্থাৎ যে মূল্য সংযোজন ও মুনাফা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা, তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে চীনের হাতে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ব বাজারের প্রতিযোগিতায় যেতে আমাদের এলডব্লিউজি সনদ জরুরি। এটা না থাকার কারণে ব্র্যান্ড বায়াররা বাংলাদেশে আসছে না। এই সনদ না থাকায় আমরা পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দামও পাচ্ছি না। কমপ্লায়েন্ট বায়ার বাংলাদেশে প্রায় একেবারেই নেই বললেই চলে। এছাড়াও নন-কমপ্লায়েন্ট বায়াররা অর্ধেক দামে চামড়া কিনে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছি। এই শিল্প গ্রো করতে পারছে না।’
চীন-ভারতের কাছে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ
এই শূন্যস্থানই কাজে লাগাচ্ছে চীন। বর্তমানে বাংলাদেশের চামড়া রফতানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য দেশ চীন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি চামড়া রফতানি হয়েছে চীনে, যার মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। কিন্তু এই রফতানির বড় অংশই কাঁচা বা স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়া।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীনা ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে চামড়া কিনে নিজেদের সনদপ্রাপ্ত কারখানায় তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে। এরপর সেই চামড়া ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে অন্য দেশের হাতে।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের চামড়া রফতানি ১ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। ভারত শুধু একটি বড় চামড়া রফতানিকারক দেশই নয়, বরং একটি শক্তিশালী মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প কাঠামো গড়ে তুলেছে। দেশটি বছরে প্রায় ৫৭০ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে। সেখানে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় এখনো ১১৪ কোটি ডলারের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ কাঁচামালের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ মূল্য সংযোজিত শিল্প গড়ে তুলতে পারেনি।
নিজস্ব ইটিপি স্থাপনে অনীহা
সিইটিপির ওপর চাপ কমাতে সরকার ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেয়। কিন্তু অনুমতি পাওয়ার পরও মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেছে। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠান এখনো তা করেনি। ট্যানারি মালিকদের দাবি, অর্থ সংকটের কারণে তারা ইটিপি স্থাপন করতে পারছেন না। একটি আধুনিক ইটিপি স্থাপনে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে অধিকাংশ ট্যানারি তার সামর্থ্য হারিয়েছে। ফলে পুরো শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিইটিপির ওপরই নির্ভরশীল রয়ে গেছে। সমস্যাটি শুধু সিইটিপিতে সীমাবদ্ধ নয়। সিইটিপি আসলে বৃহত্তর ব্যবস্থাপনা সংকটের প্রতীক। কারণ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ পেতে ১ হাজার ৭১০ নম্বরের মূল্যায়ন কাঠামো পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে ৩০০ নম্বর সরাসরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সিইটিপি-সংশ্লিষ্ট। কিন্তু বাকি নম্বরগুলো নির্ভর করে শ্রমিক নিরাপত্তা, সামাজিক কমপ্লায়েন্স, কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, ট্রেসেবিলিটি এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারেনি।
ঋণ সংকটে থমকে গেছে বিনিয়োগ
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থায়ন সংকট। প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সব থেকে বেশি চামড়া সংগ্রহ করেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে চামড়া খাতের জন্য ঋণের লক্ষ্য ঠিক করে করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বরাবরাই উদাসীনতা দেখায়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছরের ন্যায় এবার চামড়া খাতে ঋণের লক্ষ্য বেধে দিয়েছে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত বছর এ লক্ষ্য ছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা বা ১ শতাংশ। তার আগের বছর ২০২৪ সালে লক্ষ্য ৬১০ কোটি টাকার মধ্যে ব্যাংক ঋণ দেয় ১২৫ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে নির্ধারিত ৪৪৩ কোটি টাকার মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয় ২৭০ কোটি টাকা। বর্তমানে চামড়া শিল্পখাতে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।

কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্যও মিলছে না
প্রতি বছর ঈদুল আজহায় দেশে প্রায় এক কোটি পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঁচামালভিত্তিক সম্পদের একটি। কিন্তু বাজারের দুরবস্থার কারণে সেই সম্পদেরও যথাযথ মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এক সময় যে গরুর চামড়া তিন-চার হাজার টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেই চামড়ার দাম ৫০০-৭০০ টাকাও মেলা ভার। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে বাস্তবে বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
>> আরও পড়ুন
বাজার ঘুরে গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার ঘোষিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।
মিরপুর আরজাবাদ মাদরাসার (জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ) বর্তমান মুহতামিম বা অধ্যক্ষ হলেন মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে থাকে, এটা মূলত ‘ভেলকিবাজি’, যা বাস্তবে কার্যকর হয় না। এবারও হচ্ছে না। আমরা যে চামড়া সংগ্রহ করি সেটার ন্যায্যমূল্য পাই না। অনেকেই চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ অপরিহার্য
একটি বড় গরুর চামড়া সংরক্ষণে ৭ থেকে ১০ কেজি লবণ লাগে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লবণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ৭৪ কেজির একটি বস্তা লবণের দাম এখন ১১০০ টাকার উপরে। যা গতবছরেও ৯০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃত্রিম সংকটের কারণে লবণের দাম বেড়েছে। এতে সংরক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক সংগ্রহকারী এখন চামড়া সংগ্রহকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখছেন না।
ভ্যালু অ্যাডিশনে পিছিয়ে বাংলাদেশ
অন্যদিকে বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোও এখনো মূলত ওয়েট ব্লু ও ক্রাস্ট লেদারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে ফিনিশড লেদার, ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং বিলাসবহুল ফ্যাশন পণ্য থেকে। বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। ফলে কাঁচামাল থাকলেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ অন্য দেশের হাতে চলে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে ফিনিশড লেদার, ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও ফ্যাশন পণ্য থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের বড় অংশের রফতানি এখনো ওয়েট ব্লু ও স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে কাঁচামালের মালিক হয়েও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চামড়া রফতানি নয়, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, ফ্যাশন এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে প্রবেশ করতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

পরিবেশগত দুর্বলতা এখন বাণিজ্যিক ঝুঁকি
বিশ্ববাজারে এখন পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কঠোর। ফলে সিইটিপির দুর্বলতা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি রফতানি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সনদ ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চামড়া রফতানি আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
সামনে কী পথ?
চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাভারের সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নেই। একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্যানারিগুলোতে নিজস্ব ইটিপি স্থাপন, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন এবং দ্রুত এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের রোডম্যাপ। ব্যবসায়ীরা একটি স্বতন্ত্র জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠনের দাবিও জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই খাতে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কাঁচামাল আছে, শ্রমশক্তি আছে, ঐতিহ্য আছে, বৈশ্বিক চাহিদাও আছে। নেই শুধু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা এবং সমন্বিত নীতি সহায়তা। ফলে বাংলাদেশের চামড়া কম দামে কিনে মূল্য সংযোজনের মুনাফা তুলে নিচ্ছে চীন ও ভারত। আর যে খাত তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় বৃহৎ রফতানি খাত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেটি আজও সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝখানে আটকে আছে। সাভারের সিইটিপি সংকটের সমাধান না হলে সেই দূরত্ব আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
>> আরও পড়ুন
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের চামড়া খাত অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। দেশের চামড়া শিল্পের উন্নয়নে এলডব্লিউজি না থাকায় আমরা বিশ্বাবাজার হারাচ্ছি। এই সনদ অর্জন করতে হবে। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সনদ ছাড়া চামড়া রফতানি খুবই কঠিন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের চেষ্টা করা উচিত যাতে সব নিয়ম মেনে রফতানি করা যায়। সার্টিফিকেশনটা যাতে আমরা করতে পারি, সেজন্য সরকারও সহায়তা দিতে পারে- যাতে আমাদের ট্যানারিগুলো এই সনদ পেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রমান্বয়ে এসব বিষয়ে খুবই সেনসেটিভ। এটি না মানলে আগামীতে রফতানি মারাত্মকভাবে নেতিবাচক দিকে যাবে।
টিএই/এএস




